শ্রীভূমির চেনা পুজো থেকে কলকাতার টালিগঞ্জ—শৈশবের স্মৃতিতে এক অন্যরকম দুর্গোৎসব

Spread the news

-: আমার চোখে দুর্গাপূজা :-

।। শুভ দাস।।
(কলামিস্ট, শ্রীভূমি)
১৬ অক্টোবর : ছোটবেলা থেকেই দুর্গাপুজো মানেই আমার কাছে নিজের শহর শ্রীভূমি। এই শহরের অলিগলি, পুজোমণ্ডপের আলো, ঢাকের আওয়াজ, নতুন জামাকাপড়ের আনন্দ আর পরিচিত মানুষদের সঙ্গে উৎসবের দিনগুলি কাটানো সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো বরাবরই আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বছরের পর বছর শ্রীভূমিতেই কেটেছে পুজোর চারটি দিন। পরিচিত পরিবেশ, চেনা মুখ আর নিজের শহরের উৎসবের আমেজের মধ্যেই গড়ে উঠেছে আমার পুজোর অসংখ্য স্মৃতি।

তবে জীবনের একবার পুজো কাটানোর অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই অন্যরকম। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর মাসির বাড়িতে কলকাতার টালিগঞ্জে দুর্গাপুজো কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। সেই কয়েকটি দিনের অনুভূতি আজও স্মৃতির পাতায় বিশেষ জায়গা জুড়ে রয়েছে। নিজের শহরের পরিচিত পুজোর আবহ ছেড়ে মহানগর কলকাতার দুর্গোৎসবকে কাছ থেকে দেখা ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা।

কলকাতার পুজোর মধ্যে যেন অন্য এক ছন্দ রয়েছে। বড় বড় পুজোমণ্ডপ, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, মানুষের ঢল, রাত জেগে ঠাকুর দেখা আর শহরের উৎসবমুখর পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে সেই পুজোয় ছিল এক অন্যরকম আকর্ষণ। টালিগঞ্জের রাস্তায় ঘোরাঘুরি, বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন, পছন্দের খাবার খাওয়া আর নতুন পোশাকে সেজে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা সেই দিনগুলির প্রতিটি মুহূর্ত ছিল স্মরণীয়।

পুজো মানেই তো শুধু দেবী দর্শন নয়; পুজো মানে নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ, বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে আড্ডা, মনের ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানো, ভালো ভালো খাবার খাওয়া আর কয়েকটি দিনের জন্য দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা ভুলে থাকা। কলকাতার টালিগঞ্জে সেই চেনা আনন্দগুলিই যেন নতুন রূপে ধরা দিয়েছিল। মাসির বাড়ির আন্তরিকতা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং মহানগরের পুজোকে নতুন করে আবিষ্কার করার আনন্দ সব মিলিয়ে সেই অভিজ্ঞতা ছিল ব্যতিক্রমী।

শ্রীভূমির পুজো আর কলকাতার পুজোর মধ্যে তুলনা টানার চেয়ে বরং বলা ভালো, দু’টির স্বাদ আলাদা। নিজের শহরের পুজোয় রয়েছে শিকড়ের টান, পরিচিত পরিবেশের মায়া আর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। অন্যদিকে কলকাতার পুজোয় রয়েছে বিশাল আয়োজন, নতুনত্ব এবং এক বিশেষ নগরজীবনের উচ্ছ্বাস। একটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশব থেকে বেড়ে ওঠার স্মৃতি, অন্যটি উপহার দিয়েছে জীবনের এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।

আজও যখন দুর্গাপুজো আসে, শ্রীভূমির পরিচিত রাস্তাঘাট আর পুজোমণ্ডপগুলির কথা মনে পড়ে। একই সঙ্গে ফিরে আসে মাধ্যমিক পরীক্ষার পর মাসির বাড়িতে কাটানো কলকাতার টালিগঞ্জের সেই পুজোর দিনগুলিও। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়, কিন্তু কিছু অনুভূতি কখনও পুরোনো হয় না।

জীবনের সেই বিশেষ পুজো আমাকে বুঝিয়েছিল, উৎসবের আনন্দ আসলে কোনও একটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শহর বদলায়, পরিবেশ বদলায়, মানুষের ভিড় বদলায় কিন্তু আনন্দের ভাষা একই থাকে। নতুন পোশাক, পছন্দের খাবার, ঠাকুর দেখা আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলিই পুজোকে স্মরণীয় করে তোলে। শ্রীভূমি আমার পুজোর শিকড়, আর কলকাতার টালিগঞ্জ সেই শিকড়ের বাইরে দেখা এক অন্যরকম রঙিন পৃথিবী। জীবনের সেই ব্যতিক্রমী পুজো আজও মনে করিয়ে দেয়,কিছু উৎসব ক্যালেন্ডারের চারটি দিন পেরিয়ে বহু বছর ধরে হৃদয়ের মধ্যে বেঁচে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *