আব্দুল হক, সোনাই।
বরাক তরঙ্গ, ১৪ সেপ্টেম্বর : শিক্ষাকে কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এম.সি. দাস কলেজে বাংলা, ইংরেজি, মণিপুরী, দর্শন ও ফার্সি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে শুরু হলো ‘সামার ইন্টার্নশিপ কোর্স-২০২৬’। সোমবার কলেজ অডিটরিয়ামে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই বিশেষ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ ড. বাহারুল ইসলাম লস্করের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. অনুপ কুমার দে। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপিকা ড. পৌলমী চক্রবর্তী, সোনাই বিইইও-র প্রতিনিধি এসএম ফিরোজ লস্কর, নরসিংহপুরের বিইইও-র প্রতিনিধি নীলোৎপল নাথ এবং এম.সি. দাস কলেজের আই.কিউ.এ.সি. সমন্বয়ক আফসার হোসেন লস্কর। এছাড়াও কলেজ পরিচালন সমিতির অভিভাবক সদস্য আব্দুল ওয়াজিদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথিদের উত্তরীয় প্রদান করে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অতিথি শিক্ষিকা মৌসিকা কয়েস লস্কর। এরপর দর্শন বিভাগের প্রধান মিনারা বেগম লস্কর স্বাগত ভাষণের মাধ্যমে সামার ইন্টার্নশিপ কর্মসূচির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। ড. মিঠু মহন্ত শিক্ষার্থীদের সামনে ইন্টার্নশিপ কোর্সের নীতিমালা পাঠ ও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। অনুষ্ঠানে অভিভাবক সদস্য আব্দুল ওয়াজিদ চৌধুরীসহ বিশিষ্ট অতিথিদের সংবর্ধনা জানানো হয় এবং শিক্ষার্থীদের হাতে ইন্টার্নশিপ ফাইল তুলে দেওয়া হয়।
প্রধান অতিথির ভাষণে অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. অনুপ কুমার দে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাঁর মতে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যা শেখান এবং বই থেকে শিক্ষার্থী যা অর্জন করে, তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় বাস্তব পরিবেশে সেই জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, ইন্টার্নশিপ শিক্ষার্থীদের জন্য শুধুমাত্র পাঠক্রমের একটি অংশ নয়, এটি তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বের গুণ এবং যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে বিদ্যালয় ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করার ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সমস্যা, মানুষের প্রত্যাশা এবং শিক্ষার প্রকৃত প্রয়োজন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ করবে। ড. দে আরও বলেন, ‘শিক্ষাদান’ ও ‘শিক্ষাগ্রহণ’—এই দুটি প্রক্রিয়া একে অপরের পরিপূরক। একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীকে শেখান, তখন শিক্ষক নিজেও নতুন কিছু শেখেন। একইভাবে শিক্ষার্থীরা যখন অন্যকে শেখানোর সুযোগ পায়, তখন তাদের নিজেদের জ্ঞান আরও সুদৃঢ় হয়। তাই এই ইন্টার্নশিপ কর্মসূচিকে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘learning by doing’ বা কাজের মাধ্যমে শেখার এক গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ইন্টার্নশিপ চলাকালীন তাঁদের সময়নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এম.সি. দাস কলেজের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশের পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপিকা ড. পৌলমী চক্রবর্তী শিক্ষার্থীদের সামনে ইন্টার্নশিপের দার্শনিক ও মানবিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিক্ষা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে এবং একজন শিক্ষিত মানুষকে কেবল নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য নয়, সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালনের জন্যও প্রস্তুত করে। শিক্ষার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একজন শিক্ষার্থী যখন শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়ে সমাজের মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়, তখন সে সমাজকে নতুনভাবে চিনতে শেখে। বইয়ে পড়া বিভিন্ন বিষয় তখন বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়। সেই অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সহমর্মিতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
ড. চক্রবর্তী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ইন্টার্নশিপকে শুধুমাত্র নম্বর পাওয়া বা একটি সার্টিফিকেট অর্জনের কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে নিজেদের ব্যক্তিত্ব গঠন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতা মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, তিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখান, প্রশ্ন করতে শেখান এবং মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেন। তাই ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যদি অন্যদের শেখানোর সুযোগ পায়, তবে সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের নিজেদের মধ্যেও একজন ভালো শিক্ষক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার বীজ বপন করবে। বক্তব্যের পাশাপাশি ড. পৌলমী চক্রবর্তী একটি রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করেন। তাঁর গান উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অতিথিদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।
সমাজ-বিদ্যালয়-কলেজের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়বে ইন্টার্নশিপ
কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল ও সামার ইন্টার্নশিপ কর্মসূচির সমন্বয়ক ড. আব্দুল মতিন লস্কর তাঁর বক্তব্যে কর্মসূচির বিস্তারিত কার্যক্রম তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই ইন্টার্নশিপের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কলেজ, বিদ্যালয়, প্রশাসন এবং বৃহত্তর সমাজের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীরা বাস্তব ক্ষেত্রে কাজ করার মাধ্যমে শুধু অভিজ্ঞতা অর্জন করবে না, বরং সমাজের প্রতি নিজেদের দায়িত্বও উপলব্ধি করবে। তিনি জানান, কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট সময় ধরে শিক্ষাদান ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে। এর ফলে তাঁদের যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে কাজ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
আইকিউএসি সমন্বয়ক আফসার হোসেন লস্কর শুভেচ্ছা বক্তব্যে এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এমন বাস্তবমুখী কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোনাই ও লক্ষীপুরের বিইইও-র প্রতিনিধি ফিরুজ লস্কর ও মনুজ শুকলবৈদ্য তাঁদের বক্তব্যে ইন্টার্নশিপ কর্মসূচিতে বিদ্যালয়গুলির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
ধামাইল ও রবীন্দ্রসঙ্গীতে সাংস্কৃতিক আবহ অনুষ্ঠানের মাঝপর্বে মঞ্চস্থ হয় ঐতিহ্যবাহী ধামাইল নৃত্য। বাংলা বিভাগের অতিথি শিক্ষিকা মণিদীপা দাসের ব্যবস্থাপনায় পরিবেশিত এই লোকনৃত্য অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। লোকজ ছন্দ, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক আবেগে উপস্থিত দর্শকরা মুগ্ধ হন।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে তৃতীয় সেমেস্টারের ছাত্রী মহিমা শুকলবৈদ্য একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাঁর সুরেলা পরিবেশনা সমাপনী পর্বের আগে অডিটরিয়ামে এক মনোরম সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করে।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদজ্ঞাপন করেন ড. মিঠু মহন্ত। সবশেষে সভাপতির সমাপনী ভাষণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় সামার ইন্টার্নশিপ কোর্স-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের জ্ঞানকে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে তাঁদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপনের এই উদ্যোগকে ঘিরে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী মহলে ব্যাপক উৎসাহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই ইন্টার্নশিপ কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনে নতুন দিশা দেখানোর পাশাপাশি এমসিডি কলেজ ও বৃহত্তর সমাজের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন গড়ে তুলবে।



