জনগণনায় আর আলাদা নয় ‘ভিক্ষুক’রা, প্রথমবার বড় পরিবর্তন

Spread the news

২৫ আগস্ট : ভারতের আসন্ন জনগণনা-২০২৭ এ ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে আর আলাদা করে তথ্য সংগ্রহ করা হবে না। ইতিহাসে এই প্রথম ‘ভিক্ষুক ও ভবঘুরে’ নামে পৃথক কোনও শ্রেণি রাখা হচ্ছে না। নতুন জনগণনা প্রশ্নপত্রে ‘নন-ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটি’ বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন—এমন ব্যক্তিদের তালিকা থেকে এই বিভাগটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে আগামী জনগণনার পরে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে দেশের মোট ভিক্ষুকের সংখ্যা, তাঁদের বয়স, ধর্ম, রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি নিয়ে পৃথক তথ্য আর পাওয়া যাবে না। এই ধরনের ব্যক্তিদের ‘others’ বা ‘অন্যান্য’ শ্রেণির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানা গিয়েছে।

কেন্দ্রীয় সূত্রের বক্তব্য, আগের জনগণনাগুলিতে এই শ্রেণিতে যে সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল, তা বাস্তব পরিস্থিতির নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন বলে মনে করা হয়নি। সেনসাস ২০১১-এ মাত্র প্রায় ৩.৮ লক্ষ প্রান্তিক কর্মচারী বা নির্দিষ্ট কোনও পেশা নেই বা কিছুই করেন না এমন মানুষরা নিজেদের ‘ভিক্ষুক ও ভবঘুরে’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এর আগে ২০০১ সালের জনগণনায় ভারতের প্রায় ৬.৩ লক্ষ আর ১৯৯১ সালে প্রায় ৫.৪ লক্ষ মানুষ এই শ্রেণিতে।

প্রশাসনিক আধিকারিকদের মতে, ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে সামাজিক স্টিগমা অর্থাৎ ছুঁতমার্গ, সামাজিক কলঙ্ক, নীচু চোখে দেখার মতো বিষয় জড়িয়ে থাকায় অনেকেই নিজেদের ভিক্ষুক হিসেবে পরিচয় দিতে চান না। ফলে জনগণনায় এই শ্রেণির প্রকৃত সংখ্যা উঠে আসেনি বলেই মনে করা হচ্ছে।

জনগণনার নিয়ম অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তির পেশা বা ‘নন-ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটি’ তাঁর নিজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই নথিভুক্ত করেন ইনিউমেরেটর বা জনগণনা কর্মী। ফলে কেউ নিজেকে ভিক্ষুক হিসেবে উল্লেখ না করলে তাঁকে সেই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও থাকে না।

নতুন প্রশ্নপত্রে ‘ভিক্ষুক ও ভবঘুরে’ (beggars and vagrants) আলাদা অপশন না থাকায় এই ধরনের ব্যক্তিদের ‘অন্যান্য’ শ্রেণিতে রাখা হবে। এর অর্থ, জনগণনার মূল তথ্যভাণ্ডারে তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য থাকলেও ‘ভিক্ষুক’ হিসেবে আলাদা করে পরিসংখ্যান তৈরি করা যাবে না।

ফলে ভবিষ্যতে কোনও রাজ্যে কতজন মানুষ ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের মধ্যে কতজন শিশু বা প্রবীণ, কোন ধর্ম বা শিক্ষাগত গোষ্ঠীতে তাঁদের সংখ্যা বেশি—এই ধরনের বিস্তারিত জনগণনা-ভিত্তিক বিশ্লেষণ আর সরাসরি করা সম্ভব হবে না।

ভিক্ষাবৃত্তির আলাদা বিভাগ বাদ দেওয়ার পাশাপাশি সেনসাস ২০২৭-এর প্রশ্নপত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো অভিবাসনের কারণ হিসেবে এ বার ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’-কে আলাদা কারণ হিসেবে যুক্ত করা হচ্ছে।

আগের জনগণনায় কাজ, ব্যবসা, শিক্ষা, বিয়ে, জন্মের পর পরিবারের সঙ্গে স্থানান্তর এবং অন্যান্য কারণের মতো বিষয়গুলি নথিভুক্ত করা হতো। এ বার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কেউ স্থানান্তরিত হয়েছেন কি না, সেটিও আলাদাভাবে উল্লেখ করা হবে।

Census 2027-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো বাবা-মায়ের জন্মসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ। প্রত্যেক নাগরিকের বাবা-মায়েরও বিস্তারিত তথ্যও নেবে কেন্দ্র। নতুন ফর্মে বাবা ও মায়ের জন্মতারিখ, জন্মস্থান এবং ধর্ম সম্পর্কিত তথ্যের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে বাবা-মা যদি একই পরিবারের সদস্য হিসেবে ইতিমধ্যেই তালিকাভুক্ত থাকেন, কিংবা তাঁরা আর জীবিত না থাকেন, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তথ্য পূরণ করার প্রয়োজন হবে না বলে সূত্রের খবর।

এই তথ্য থেকে ভবিষ্যতে ভিন্ন ধর্মে বিবাহের প্রবণতা এবং ধর্মান্তরের মতো সামাজিক পরিবর্তনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সরকারি সূত্র মনে করছে। পাশাপাশি বাবা-মায়ের জন্মস্থান ও জন্মতারিখের তথ্য নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণেও সহায়ক হতে পারে।

Census 2027-এর ফর্মে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, পাসপোর্টের নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে—তবে তা ‘যদি থাকে’ এই ভিত্তিতে। আধিকারিকদের মতে, জনগণনা কর্মীরা এই তথ্য দিতে বাসিন্দাদের উৎসাহিত করবেন। কিন্তু কোনও ব্যক্তি তথ্য দিতে অনিচ্ছুক হলে তাঁকে বাধ্য করা হবে না এবং সংশ্লিষ্ট ঘরটি ফাঁকা রাখা যাবে।এর ফলে কোন ধরনের পরিচয়পত্রের তথ্য মানুষ তুলনামূলক ভাবে বেশি বা কম শেয়ার করতে চাইছেন, সেই প্রবণতাও প্রশাসনের কাছে পরিসংখ্যান হিসেবে উঠে আসতে পারে।

১৯৩১ সালের পরে এই প্রথম সর্বভারতীয় জনগণনায় জাতিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের কাজ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে জনসংখ্যা গণনার সময়ে জাতি বা caste-এর তথ্যও সংগ্রহ করা হবে। অর্থাৎ, একদিকে জাতি, বাবা-মায়ের জন্মস্থান ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নতুন তথ্য যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ভিক্ষুক ও ভবঘুরেদের মতো একটি পুরোনো পৃথক শ্রেণি বাদ পড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *