ধর্ম নয়, মাতৃভাষার পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান
মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ২১ জুলাই : ১৯৬১ সালের ১৯ মে এবং ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনে আত্মবলিদানকারী ভাষা শহিদদের স্মরণে মঙ্গলবার শ্রীভূমিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় ভাষা শহিদ দিবস। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে শম্ভুসাগর উদ্যানের ভাষা শহিদ স্মারক প্রাঙ্গণে মাল্যদান, পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন এবং স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বাঙালির আত্মপরিচয় এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে ঐক্যের ওপর জোর দেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সতু রায় বলেন, ধর্মীয় বিভাজন ভুলে মাতৃভাষার পরিচয়ে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাঁর বক্তব্য, ভাষার প্রশ্নে ঐক্যই বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি দাবি করেন, অতীতের মতো এখনও বিভিন্নভাবে বাঙালি জাতিসত্তাকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।

সতু রায় আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্ম ভাষা আন্দোলনের উত্তরসূরি হিসেবে কতটা দায়িত্ব পালন করছে, তা নিয়ে আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তরুণ সমাজকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলেও তিনি আহ্বান জানান।
বরাকবঙ্গের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সুবীর রায় চৌধুরী বলেন, অতীতে ভাষা সার্কুলারের মাধ্যমে যে আঘাত এসেছিল, বর্তমানে বিভিন্ন উপায়ে ভাষা ও সংস্কৃতিকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। তাই অখণ্ড বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ সময়ের দাবি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সভায় সংগঠনের সহসভাপতি মাশুক আহমদ ১৯৬১ ও ১৯৮৬ সালের সব ভাষা শহিদকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া, মেহেরোত্রা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ এবং ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত ভাষা সার্কুলার সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানান। পাশাপাশি শম্ভুসাগর উদ্যানের ভাষা শহিদ স্মারক প্রাঙ্গণের পরিচ্ছন্নতা ও সংরক্ষণে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বানও জানান তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন শহর সমিতির সভাপতি সৌমিত্র পাল। বক্তব্য রাখেন শ্রীভূমি পুরসভার পুরপতি রবীন্দ্রচন্দ্র দেব, বিজেপির জেলা সভাপতি সঞ্জীব বণিক, নির্মলকুমার সরকার, রজত চক্রবর্তী, সুখেন্দুবিকাশ পাল, মলয় চৌধুরী, পূর্ণিমা চৌধুরী, রতিরঞ্জন শর্মা, কালীপদ নাথ, সুব্রত ভট্টাচার্য প্রমুখ। স্বাগত ভাষণ দেন শহর সমিতির সম্পাদক নিলজকান্তি দাস।
অনুষ্ঠানে জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। দেশাত্মবোধক সঙ্গীত, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়। এছাড়া শম্ভুসাগর উদ্যান, জেলা আয়ুক্তের বাংলোর সামনে এবং পূর্ত বিভাগের কার্যালয়ের সামনে অবস্থিত তিনটি শহিদ বেদীতেও পৃথকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। অনুষ্ঠানে ভাষা আন্দোলনের প্রবীণ সেনানী, শহিদ পরিবারের সদস্য এবং বহু ভাষাপ্রেমী নাগরিক উপস্থিত ছিলেন।



