জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আরটিআই আবেদন
বরাক তরঙ্গ, ২০ জুলাই : হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমি জেলায় পৃথক ফ্যামিলি কোর্ট স্থাপনের দাবিকে তথ্যভিত্তিকভাবে আরও জোরালো করার লক্ষ্যে শিলচরের বিশিষ্ট আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব আজ তথ্য জানার অধিকার (আরটিআই) আইন, ২০০৫-এর আওতায় হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পৃথকভাবে আবেদন দাখিল করেছেন।
আরটিআই আবেদনে দুই জেলার পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত মামলার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিবাহ বিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব, সন্তানের হেফাজত, দাম্পত্য অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত কতগুলি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে, সেই তথ্য।
এছাড়াও, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ ক্যালেন্ডার বছরে কতগুলি পারিবারিক বিরোধ মামলা দায়ের হয়েছে এবং কতগুলি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, তার বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে কোন কোন আদালত এবং কোন পদমর্যাদার বিচারিক কর্মকর্তার সামনে এসব মামলা বিচারাধীন রয়েছে, সেই তথ্যও জানতে চাওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমি জেলায় পৃথক ফ্যামিলি কোর্ট স্থাপনের বিষয়ে জেলা বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব, সুপারিশ, পত্রাচার বা প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। যদি এমন কোনো নথি থেকে থাকে, তবে তার প্রত্যয়িত অনুলিপি প্রদানেরও আবেদন করা হয়েছে।
আরটিআই আবেদনে আরও জানতে চাওয়া হয়েছে, পারিবারিক বিরোধ মামলার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলাগুলিতে বিচারিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কতগুলি পদ অনুমোদিত রয়েছে এবং সেগুলির বর্তমান অবস্থা কী।
ধর্মানন্দ দেব জানান, পারিবারিক বিরোধ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য পৃথক ফ্যামিলি কোর্ট অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি বলেন, “দুই জেলায় পারিবারিক বিরোধ মামলার প্রকৃত সংখ্যা, মামলা নিষ্পত্তির হার এবং বিচারিক অবকাঠামোর বাস্তব চিত্র সামনে আনতেই এই আরটিআই আবেদন করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য পৃথক ফ্যামিলি কোর্ট স্থাপনের দাবিকে আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।”
তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, দেশভাগের পূর্বে কাছাড় জেলায় কোনো স্থায়ী সেশনস কোর্ট ছিল না। সে সময় সিলেট সেশনস কোর্টের সার্কিট কোর্ট শিলচরে বসত এবং দেশভাগ পর্যন্ত তা কার্যকর ছিল। দেশভাগের পর বৃহত্তর কাছাড় জেলা দীর্ঘদিন জোরহাটের জেলা ও দায়রা জজের অধীন ছিল। পরবর্তীতে ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫ সালে কাছাড় জেলার জেলা ও দায়রা জজ দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যার অধীনে বর্তমান শ্রীভূমি (তৎকালীন করিমগঞ্জ) ও হাইলাকান্দি জেলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন কাছাড় জেলার করিমগঞ্জ মহকুমা ১ জুলাই ১৯৮৩ সালে জেলায় উন্নীত হয় এবং সেখানে জেলা ও দায়রা জজ আদালত ১০ মে ১৯৮৫ সালে উদ্বোধন করা হয়। একইভাবে, করিমগঞ্জ জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ১৩ জুলাই ১৯৮৩ সালে উদ্বোধন করা হয়।
ফ্যামিলি কোর্ট প্রতিষ্ঠার আইনি দিক ব্যাখ্যা করে ধর্মানন্দ দেব বলেন, ফ্যামিলি কোর্টস অ্যাক্ট, ১৯৮৪-এর ধারা ৭ ও ৮ অনুযায়ী পারিবারিক বিরোধ, বিবাহ বিচ্ছেদ, হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট বা স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টের অধীন ডিভোর্স সংক্রান্ত মামলা মূলত ফ্যামিলি কোর্টের এখতিয়ারভুক্ত। তবে যেখানে পৃথক ফ্যামিলি কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেখানে জেলা আদালত এসব বিষয় বিচার করতে পারে।
তিনি জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪ সালে প্রণীত ফ্যামিলি কোর্টস অ্যাক্ট, ১৯৮৪-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পারিবারিক ও বৈবাহিক বিরোধের দ্রুত, নিরাপদ ও কার্যকর নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ফ্যামিলি কোর্ট প্রতিষ্ঠা করা।
উল্লেখ্য, হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমি জেলায় দীর্ঘদিন ধরেই পৃথক ফ্যামিলি কোর্ট স্থাপনের দাবি উঠছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পারিবারিক বিরোধ মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যমান আদালতগুলির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, ফলে মামলার নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পৃথক ফ্যামিলি কোর্ট স্থাপন সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত ও কার্যকর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।



