কাজিরাঙার কিংবদন্তি টহল হাতি ‘জয়মালা’-র প্রয়াণ, ৩৪ বছরের সংরক্ষণ যাত্রার অবসান

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ৫ জুলাই : ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজিরাঙার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বনকর্মীরা শেষবারের মতো বিদায় জানান তাঁদের দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে—যে সঙ্গী তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। সেদিন আর কোনো টহল ছিল না, গণ্ডার রক্ষার দায়িত্ব ছিল না, নদী পেরোনোরও প্রয়োজন ছিল না। ছিল শুধু নীরবতা, কৃতজ্ঞতা এবং এক নিবেদিতপ্রাণ হাতির প্রতি সম্মান জানিয়ে গার্ড অব অনার।

কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ও টাইগার রিজার্ভের অন্যতম প্রবীণ টহল হাতি জয়মালা শনিবার রাতে ৬৬ বছর বয়সে দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর মারা যায়। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো ৩৪ বছরের এক গৌরবময় বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের অধ্যায়।

জয়মালার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বন দফতরের পক্ষ থেকে তাঁকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং পূর্ণ মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। এই বিরল সম্মান কাজিরাঙার মতো ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের সুরক্ষায় টহল হাতিদের অপরিহার্য ভূমিকারই স্বীকৃতি।

১৯৬০ সালে জন্ম নেওয়া জয়মালা ১৯৯২ সালে কাজিরাঙার হাতি টহল বাহিনীতে যোগ দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সে বন দফতরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অগ্রসারির সদস্যে পরিণত হয়। চোরাশিকার বিরোধী অভিযান, বন্যপ্রাণ পর্যবেক্ষণ, উদ্ধারকাজ এবং নিয়মিত বন টহলে বনরক্ষীদের পিঠে বহন করে সে পৌঁছে যেত জলমগ্ন জলাভূমি, উঁচু হাতিঘাসে ঢাকা এলাকা এবং ঘন অরণ্যে—যেখানে কোনো যানবাহনের পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বন দফতর জানিয়েছে, প্রায় এক বছর ধরে আগোরাতলি রেঞ্জের নালনি এলাকায় জয়মালার চিকিৎসা চলছিল। তার মৃত্যু শুধু একটি টহল হাতির মৃত্যু নয়, বরং কাজিরাঙার সংরক্ষণ ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের সমাপ্তি।

বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণপ্রেমীদের কাছে জয়মালা বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে ২০০৪ সালে, যখন জঙ্গলে টহলের সময় তার উপর দিয়ে একটি বাঘ লাফিয়ে যাওয়ার বিরল মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি হয়। সেই ঐতিহাসিক ছবি ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও সাড়া ফেলে এবং কাজিরাঙার অন্যতম প্রতীকী বন্যপ্রাণ আলোকচিত্রে পরিণত হয়। ছবিটি প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অরণ্যে টহল দেওয়া হাতি ও মাহুতদের সাহসিকতার প্রতীক হিসেবেও স্বীকৃতি পায়।

দীর্ঘ কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় জয়মালার সঙ্গী ছিলেন অভিজ্ঞ মাহুত সত্যবান পেগু। হাজার হাজার টহল অভিযানে দু’জনের মধ্যে গড়ে ওঠে এক অনন্য সম্পর্ক। জীবনের শেষ পর্বে মাহুত নীলকান্ত কোচ তার দেখভালের দায়িত্ব নেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন।

একশৃঙ্গ গণ্ডারের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত কাজিরাঙায় টহল হাতিরা এখনও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তি। জলাভূমি, বন্যার জল ও ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে চলাচলের ক্ষমতার কারণে বনরক্ষীরা এমন সব দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে পারেন, যেখানে যানবাহন পৌঁছাতে পারে না। বিশেষ করে বার্ষিক বন্যার সময় চোরাশিকার রোধ, বন্যপ্রাণ উদ্ধার এবং বিপন্ন প্রজাতির নজরদারিতে এই টহল হাতিরাই সংরক্ষণ কার্যক্রমের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *