মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১৪ জুন : শিক্ষকদের ঐক্য সুদৃঢ় করা, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং আগামী দিনের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রত্যয়ে রবিবার পাথারকান্দিতে অনুষ্ঠিত হল শ্রীভূমি জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সম্মিলনীর ৪৬তম দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন। দিনব্যাপী এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাবিদ, শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে পাথারকান্দি পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। সকাল থেকেই পাথারকান্দির রবীন্দ্রভবন প্রাঙ্গণে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ৮টায় সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সম্মিলনীর সভাপতি আজমল হোসেন সংগঠনের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। পরে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষিকারা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান ও শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। এরপর সভাপতি আজমল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কার্যকরী সভায় শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, সাংগঠনিক উন্নয়ন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সাংগঠনিক পর্বের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্মেলনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। সংগীত, আবৃত্তি ও বিভিন্ন পরিবেশনায় শিক্ষকদের সৃজনশীল প্রতিভার প্রকাশ ঘটে।

দুপুর ২টায় শুরু হয় প্রকাশ্য অধিবেশন। প্রদীপ প্রজ্বলন ও ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। জেলার ছয়টি প্রাথমিক শিক্ষা খণ্ড থেকে আগত প্রতিনিধিদের উত্তরীয় পরিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। স্থানীয় মডেল উচ্চতর বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শ্যামাপদ দের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি তরুণ কুমার সিনহা শিক্ষক সংগঠনের ঐতিহ্য ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
পাথারকান্দি খণ্ড প্রাথমিক শিক্ষক সম্মিলনীর সভাপতি ফখরুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দেশপ্রেম গড়ে তোলার দায়িত্বও শিক্ষকদের উপর বর্তায়। তিনি বলেন, এই সম্মেলন অভিজ্ঞতা বিনিময়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ও শিক্ষার মানোন্নয়নে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। পরে জেলা সাধারণ সম্পাদক গৌরিশ রায় গত দুই বছরের সাংগঠনিক কার্যক্রম, অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে দ্বি-বার্ষিক প্রতিবেদন পাঠ করেন। প্রতিবেদনে শিক্ষক কল্যাণমূলক উদ্যোগসহ সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত পাথারকান্দি বিএড কলেজের অধ্যক্ষ আইনুল হক শিক্ষক সম্মিলনীকে একটি বৃহৎ বটবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, সংগঠনটি শুধু শিক্ষকদের অধিকার রক্ষাই নয়, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিক্ষকদের নিজেদের আরও দক্ষ করে তোলার আহ্বান জানান।
সভায় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ দেবাশিস সিনহা, জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক খয়রুল ইসলাম হাজারী, শ্রীভূমি জেলা সিআরসি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইদুল হাসান, পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষক আবুল কালাম, পূর্ণব্রত দাস, নজমুল হোসেনসহ আরও অনেকে বক্তব্য রাখেন। বক্তারা শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে মতামত ব্যক্ত করেন।

সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিদায়ী পদাধিকারীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। শিক্ষক সমাজের কল্যাণ ও সংগঠনের উন্নয়নে তাঁদের দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ উত্তরীয় ও স্মারক প্রদান করে সম্মান জানানো হয়। এসময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বিকেল ৫টায় প্রকাশ্য অধিবেশন সমাপ্ত হওয়ার পর সভাপতি আজমল হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায়ী কমিটি ভেঙে দিয়ে আগামী দুই বছরের জন্য নতুন কার্যকরী কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।
রাত পর্যন্ত প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, নতুন কমিটি নির্বাচনের ভোট গণনার কাজ চলছিল। ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষায় ছিলেন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিক্ষক প্রতিনিধিরা। নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে সংগঠন আগামী দিনে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উপস্থিত শিক্ষক সমাজ।



