
মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ১৯ মে : মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং ১৯৬১ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে বাজারিছড়ায় পালিত হলো একাদশ ভাষা শহিদ দিবস। বাজারিছড়ার ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কালাছড়া নেতাজী সংঘের উদ্যোগে মঙ্গলবার দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে ভাষা শহিদদের স্মরণ করা হয়। সকাল থেকেই গোটা বাজারিছড়া অঞ্চলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও এবং ঝিরিঝিরি বৃষ্টি উপেক্ষা করেও মাতৃভাষাপ্রেমী মানুষজন ভিড় জমান স্থানীয় হসপিট্যাল রোডস্থিত নেতাজী সংঘের স্থায়ী শহিদ বেদী প্রাঙ্গণে। সেখানে ভাষা শহিদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রথমে পুষ্পার্ঘ ও মাল্যদান অর্পণ করেন সংঘের কর্মকর্তারা। পরে নীরবতা পালন ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের শহিদদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।
এদিন “বাংলা আমার মাতৃভাষা”, “ভাষা শহিদ অমর রহে”, “মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতেই হবে” প্রভৃতি স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। মাইকে ভেসে আসে ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত গান ও ভাষণ। উপস্থিত মানুষের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং নতুন প্রজন্মের সামনে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
পরে শহিদ বেদী প্রাঙ্গণে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কালাছড়া নেতাজী সংঘের সভাপতি প্রমেশ দাস। সভার শুরুতেই ভাষা শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন সংঘের প্রাক্তন সভাপতি মনিষ ভূষণ পাল, অমিতাভ দে এবং প্রাক্তন সভাপতি তথা লোয়াইরপোয়া জেলা পরিষদের সদস্য স্বপন দাস প্রমুখ। বক্তারা বলেন, ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু বরাক উপত্যকার নয়, সমগ্র বাঙালি সমাজের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে এগারোজন ভাষা শহিদ আত্মবলিদান দিয়েছিলেন, যার ফলেই বরাক উপত্যকায় বাংলা সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করে।
বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে একাংশ পড়ুয়ার মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক। মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং প্রসারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলেন, “মাতৃভাষা মায়ের দুধের সমান—এই ভাষাকে ভালোবাসা, রক্ষা করা এবং আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নেতাজী সংঘের সাধারণ সম্পাদক অমিত দেব, উপদেষ্টা সদস্য রজত নাগ, অনুপ দে, কোষাধ্যক্ষ সন্দীপ পাল, শিক্ষক মনোজ দাশগুপ্ত, আশীষ চক্রবর্তী, অনুপম মালাকার, প্রদীপ দেবনাথ, গৌতম সিংহ, রাজকুমার দাস, শুভ্র পাল, রাজু নাগ, শঙ্কু দাস, অরবিন্দ রায় সহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষ।
দিনব্যাপী কর্মসূচির শেষপর্বে সন্ধ্যাবেলায় ভাষা শহিদদের স্মরণে বৃহত্তর বাজারিছড়া এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের বাড়িতে এগারোটি করে মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়। মোমবাতির আলোকশিখায় ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ ও বাংলা ভাষার চিরন্তন মর্যাদার প্রতীক ফুটে ওঠে। উপস্থিত ব্যক্তিদের মতে, কালাছড়া নেতাজী সংঘের এই উদ্যোগ শুধু ভাষা শহিদদের স্মরণ নয়, বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সচেতনতা ও ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।



