অশান্ত সাব্রুম পরিদর্শনে মুখ্যমন্ত্রী, সবাইকে সংযত থাকার আহ্বান

Spread the news

এডিসি নির্বাচনের পর ত্রিপুরায় হিংসার দাবানল!

বরাক তরঙ্গ, ২২ এপ্রিল : ত্রিপুরা রাজ্যের এডিসি নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই ত্রিপুরা জুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন সম্পন্ন হলেও ফল ঘোষণার পর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমা এখন অশান্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র দলীয় সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বহু পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, দোকানপাট বন্ধ, বাজার-হাট স্তব্ধ, সন্ধ্যার পর জনজীবন কার্যত থমকে যাচ্ছে। এলাকাবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।বিজেপি নেতৃত্ব সরাসরি অভিযোগ তুলেছে যে, তিপ্রামথা দলের একাংশ নেতা-কর্মীরাই পরিকল্পিতভাবে এই অশান্তি ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে সাব্রুমের ২৮ শিলাছড়ি-মনুবনকুল কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থীর জয়ের পর থেকেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিজয় মেনে নিতে না পেরে বিরোধী শিবিরের একাংশ প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একাধিক বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে, বহু পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং বাজার-হাট জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। লিধুয়া নিচের বাজার, চাতকছড়ি, চালিতা বনফুল এবং বনকুল নতুন বাজার—এই সমস্ত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি অফিসগুলির ধ্বংসস্তূপ আজ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে দুষ্কৃতীরা হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বহু মানুষ ঘর ছেড়ে আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রশাসনের কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বুধবার সাব্রুমে পৌঁছান মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা।

তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং আক্রান্ত পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলেন। পাশাপাশি স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব, প্রশাসনিক আধিকারিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নেন।পরিদর্শন শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “গণতন্ত্রে নির্বাচন হবে, ফলাফল আসবে—এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ফলাফলকে কেন্দ্র করে হিংসা, প্রতিহিংসা এবং অশান্তি কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সবাইকে সংযম বজায় রাখতে হবে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।”তিনি আরও বলেন, “ত্রিপুরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দাবানল ছড়িয়ে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়, মানুষের মধ্যে বৈরীভাব তৈরি করতে চায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনও অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।

মুখ্যমন্ত্রী এদিন সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি প্রশাসনকে কড়া নজরদারির নির্দেশ দেন যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।এই গুরুত্বপূর্ণ পরিদর্শনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক অনুরাগ ধনকর, মুখ্যসচিব জে কে সিনহা, দক্ষিণ ত্রিপুরার জেলাশাসক মোহাম্মদ সাজ্জাদ পি, পুলিশ সুপার মরিয়া কৃষ্ণা সি সহ একাধিক শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এডিসি নির্বাচনের পর এই অস্থিরতা আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়—প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ এবং মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে কত দ্রুত স্বাভাবিক করতে পারে।

ত্রিপুরার মানুষ এখন একটাই জিনিস চাইছেন শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনে দ্রুত ফিরে আসার নিশ্চয়তা। গণতন্ত্রের উৎসব যেন হিংসার আগুনে পুড়ে না যায় সেই  প্রত্যাশাই আজ সর্বত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *