মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১৫ মার্চ : শ্রীভূমিতে শুরু নির্বাচনী বিধি, কড়া নজর প্রশাসনের জেলা কমিশনারের সাংবাদিক সম্মেলন ২৪ ঘণ্টায় সরকারি সম্পত্তি থেকে প্রচারসামগ্রী অপসারণ, পেড নিউজে কড়া সতর্কতা। রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রশাসনিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। সেই প্রেক্ষিতেই রবিবার সন্ধ্যায় শ্রীভূমির জেলা নির্বাচনী আধিকারিক তথা জেলা কমিশনার প্রদীপকুমার দ্বিবেদী তাঁর কার্যালয়ের সভাকক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেলা কমিশনার নির্বাচন কমিশনের জারি করা আদর্শ আচরণবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। পাশাপাশি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন প্রস্তুতি, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত পরিকল্পনার বিষয়েও তিনি সাংবাদিকদের অবহিত করেন।
তিনি জানান, রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র শ্রীভূমি জেলায় নির্বাচন কমিশনের আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হয়ে গেছে। নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার সমস্ত সরকারি দপ্তর, দপ্তর প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে এই আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
জেলা নির্বাচন আধিকারিকের কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তির কথা উল্লেখ করে জেলা কমিশনার বলেন, নির্বাচন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি ও জনসাধারণের সম্পত্তিতে থাকা রাজনৈতিক প্রচারের সব ধরনের চিহ্ন দ্রুত অপসারণ করা বাধ্যতামূলক। প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি ভবন, বিভিন্ন দপ্তরের অফিস প্রাঙ্গণ, সরকারি স্থাপনা এবং অন্যান্য সরকারি সম্পত্তিতে লাগানো সব ধরনের পোস্টার, ব্যানার, ফ্লেক্স, হোর্ডিং, দেওয়াল লিখন কিংবা রাজনৈতিক প্রচার সংক্রান্ত অন্য যে কোনও উপকরণ নির্বাচন ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করতে হবে।
তিনি আরও জানান, জনসাধারণের ব্যবহারযোগ্য সম্পত্তি যেমন— রাস্তা, বিদ্যুতের খুঁটি, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, সেতু, সরকারি যানবাহন এবং অন্যান্য পাবলিক অবকাঠামোতে লাগানো রাজনৈতিক প্রচারসামগ্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হবে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে লাগানো রাজনৈতিক পোস্টার, ব্যানার বা অন্যান্য প্রচারসামগ্রীও নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে জেলা কমিশনার আরও স্পষ্টভাবে জানান, নির্বাচন ঘোষণার পর কোনও রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী সরকারি গাড়ি কিংবা সরকারি সম্পদ রাজনৈতিক প্রচারের কাজে ব্যবহার করতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনের এই নির্দেশ অমান্য করা হলে তা আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি সম্পত্তি থেকে অপসারণ করা পোস্টার, ব্যানার, ফ্লেক্স বা দেওয়াল লিখনের সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য নির্ধারিত ফরম্যাটে প্রস্তুত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন ব্যয় পর্যবেক্ষণ শাখায় জমা দিতে হবে। এই তথ্যের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারি করবে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে যে, এই নির্দেশ বাস্তবায়নে কোনও ধরনের গাফিলতি বা অবহেলা ধরা পড়লে তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে রিপোর্ট পাঠানো হবে বলেও তিনি জানান।
এছাড়াও সাংবাদিক সম্মেলনে জেলা কমিশনার বিশেষভাবে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, নির্বাচন চলাকালীন সময়ে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং বিশেষ করে বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল ও ডিজিটাল মিডিয়া কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, কোনও রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষে পেইড নিউজ, পক্ষপাতমূলক প্রচার কিংবা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর গুজব ছড়ানোর মতো সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, যদি এ ধরনের কোনও ঘটনা প্রশাসনের নজরে আসে, তাহলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা দায়ের করা হবে বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে জেলা কমিশনার বলেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শ্রীভূমি জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্তরে প্রস্তুতি শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নির্বাচন কেন্দ্রগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হল এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যাতে জেলার প্রতিটি ভোটার স্বাধীনভাবে, নির্ভয়ে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। নির্বাচনকে ঘিরে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
সবশেষে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলার সমস্ত সরকারি দপ্তর, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচন কমিশনের জারি করা আদর্শ আচরণবিধি মেনে চলার জন্য আহ্বান জানানো হয়। প্রশাসনের এই উদ্যোগকে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে একটি স্বচ্ছ, সুষ্ঠু এবং সমতাভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জেলা নির্বাচন আধিকারিক রৌশন আলম, জেলা তথ্য ও জনসংযোগ আধিকারিক সাজ্জাদুল হক চৌধুরী, রানু ভট্টাচার্য, উৎপল চক্রবর্তী সহ প্রশাসনের অন্যান্য আধিকারিকরা।



