উন্মোচন সাংবাদিক বিকাশ চক্রবর্তীর ‘আসাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত’

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ২১ জানুয়ারি : দীর্ঘ এক দশকের নিরবিচ্ছিন্ন গণআন্দোলনের ফলস্বরূপ ১৯৯৪ সালে শিলচরে প্রতিষ্ঠিত হয় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত চলা সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের লিখিত ও প্রামাণ্য ইতিহাস এতদিন প্রকাশ করতে ব্যর্থ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই তথ্যসংগ্রহ ও দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে বিশিষ্ট সাংবাদিক বিকাশ চক্রবর্তী রচনা করেছেন ‘আসাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত’ শীর্ষক গ্রন্থটি। বুধবার শিলচরের ইলোরা হেরিটেজ হলে বিশিষ্টজনের উপস্থিতিতে বইটির আনুষ্ঠানিক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়।অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লেখক বিকাশ চক্রবর্তী ছাড়াও সাময়িক প্রসঙ্গ পত্রিকার কর্ণধার তৈমুর রাজা চৌধুরী, আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রদীপ দত্তরায়, হাইলাকান্দি এস এস কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ হিলাল উদ্দিন লস্কর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নিরঞ্জন দত্ত, সমাজকর্মী স্বর্ণালি চৌধুরী, শিল্পপতি মহাবীর জৈন সহ আরও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।

সন্ধ্যা চক্রবর্তী ও সহশিল্পীদের উদ্বোধনী সঙ্গীতের পর প্রারম্ভিক বক্তব্যে বিকাশ চক্রবর্তী বলেন, স্বাধীনতার আগেই বৃহত্তর সিলেট–কাছাড় অঞ্চলে একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছিল। সাম্প্রতিককালে “আসাম বিশ্ববিদ্যালয় আসাম আন্দোলনের ফসল”—এই তথ্যবিকৃতি ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যার প্রেক্ষিতেই তিনি এই গ্রন্থ রচনার সিদ্ধান্ত নেন। আন্দোলনের খুঁটিনাটি তথ্য যতটা সম্ভব নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

মঞ্চে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বইটির আবরণ উন্মোচন করেন হিলাল উদ্দিন লস্কর। নিজের বক্তব্যে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের জন্য এই বই অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ তারা সেই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী নয়। তিনি লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধনের দিন তাঁদের অনেকেই আমন্ত্রণ পাননি। তাঁর মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার সমাধান, সাহিত্য–সংস্কৃতির বিকাশ এবং স্থানীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে গবেষণার প্রত্যাশা ছিল, যা এখনও পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়ে সকলকে চিন্তাভাবনা ও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অধ্যাপক নিরঞ্জন দত্ত বলেন, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বর্তমানে প্রায় ৬০টি কলেজ রয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে মাত্র ৯টি কলেজ স্বীকৃত ছিল। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের যে বিপুল উপকার হয়েছে তা অনস্বীকার্য। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এতদিন এই ইতিহাস প্রকাশে টালবাহানা করেছে। এই বই সেই বিতর্কে ইতি টানবে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি তৈমুর রাজা চৌধুরী বলেন, অধ্যাপক সুবীর কর রচিত আসাম বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন সংক্রান্ত পান্ডুলিপি প্রকাশে বরাকবঙ্গ আগ্রহী থাকলেও এখনও পরিবারের অনুমতি না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। অনুমতি মিললে ভবিষ্যতে সেই ইতিহাস প্রকাশে তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন বলেও জানান। ইতিহাস রচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিকাশ চক্রবর্তী সেই প্রক্রিয়ার সূচনা করেছেন, যার ভিত্তিতে আগামী দিনে আরও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হবে। তিনি গ্রন্থটি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।

শিল্পপতি মহাবীর জৈন বলেন, আকসার আন্দোলনের ফলেই আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে এবং এর কৃতিত্ব আকসা নেতৃত্বের প্রাপ্য। বই সমাজের আয়না—এই মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই গ্রন্থ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আন্দোলনের ইতিহাস বহন করবে।

আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রদীপ দত্তরায় বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন শুধু আকসার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরাক উপত্যকার সর্বস্তরের মানুষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিধায়ক, চা–বাগানের শ্রমিক এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মহিলারাও এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গসহ বরাকের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বোরো জননেতা উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্ম, ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী এবং মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালথানওয়ালার সহযোগিতার কথাও স্মরণ করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই বই পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। আকসা আন্দোলন নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন সমাজকর্মী স্বর্ণালি চৌধুরী। মনোজ্ঞ এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন গ্রন্থটির প্রকাশক সংস্থা ‘নতুন দিগন্ত প্রকাশনী’র প্রধান মিতা দাসপুরকায়স্থ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *