বরাক তরঙ্গ, ২১ জানুয়ারি : দু’জনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গত দু’দিন ধরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে কোকরাঝাড়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধে জেলার সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। গণপিটুনিতে দু’জনের মৃত্যুর পরই স্থানীয় বড়ো ও আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। কারিগাঁও এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
গত রাত থেকেই সেনা বাহিনী এলাকায় টহল দিচ্ছে। সেনার সঙ্গে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। সেনা মুখপাত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভারতীয় সেনা কারিগাঁওয়ের সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় টহল চালাচ্ছে। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করতেই এই টহল ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, মোট চারটি প্লাটুন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোকরাঝাড়ের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী চিরাং জেলাতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এর আগে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছিলেন, কোকরাঝাড়ে হিংসা ও সংঘাতের প্রেক্ষিতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স ইতিমধ্যেই সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
এদিকে, সংঘর্ষে আতঙ্কিত হয়ে কারিগাঁওয়ের কিছু বাসিন্দা বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসন আবদাং বাজার, কারিগাঁও বাজার এবং কারিগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনটি অস্থায়ী ত্রাণ শিবির খুলেছে। কর্মকর্তাদের মতে, আবদাং বাজারের শিবিরে বড়ো সম্প্রদায়ের মানুষদের রাখা হয়েছে, আর কারিগাঁওয়ে স্থাপিত শিবিরে সাঁওতাল পরিবারগুলিকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। মোট মিলিয়ে এই অস্থায়ী শিবিরগুলিতে প্রায় ১,২০০ জনকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। শান্তি বজায় রাখা এবং যে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে কারিগাঁও এলাকায় সেনা, অসম পুলিশ, সিআরপিএফ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছেন। আইজিপি বিবেকরাজ সিং জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তিনি সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
অসম পুলিশের মহাপরিচালক হরমিত সিংসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কারিগাঁওয়ে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অন্যদিকে, পুলিশ মহাপরিদর্শক অখিলেশ সিং জানিয়েছেন, আইন হাতে তুলে নেওয়ার কোনও সুযোগ দেওয়া হবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে বিক্ষোভকারীরা জাতীয় সড়কে দু’টি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাশাপাশি বীরসা কমান্ডোর অস্থায়ী শিবির, নির্মীয়মাণ বীরসিং মুন্ডা সাংস্কৃতিক প্রকল্প চত্বরে অবস্থিত শ্রমিক আবাসন এবং কারিগাঁও সংলগ্ন এলাকার একাধিক বাড়িতে আগুন লাগানো হয় ও দোকানপাটে ভাঙচুর চালানো হয়। পুলিশ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও বিক্ষোভকারীরা কোনও কথা শোনেনি। বিক্ষোভের ফলে জাতীয় সড়কে সারি সারি যানবাহন আটকে পড়ে। এর মধ্যে ভুটানের একাধিক পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী যানও আটকে যায়।
উল্লেখ্য, গৃহ দপ্তরের এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার রাতে কোকরাঝাড়ের কারিগাঁওয়ে একটি গাড়ির ধাক্কায় দু’জন আদিবাসী ব্যক্তি আহত হন। গাড়িটিতে তিনজন বড়ো যুবক ছিলেন। এরপর আদিবাসী গ্রামের কয়েকজন ওই তিন যুবককে মারধর করে এবং ক্ষুব্ধ জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয় এবং অপরজন মঙ্গলবার হাসপাতালে মারা যান। আহত আরও তিনজন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মঙ্গলবার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড়ো ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। উভয় পক্ষই কারিগাঁও সংযোগকারী জাতীয় সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা একটি সরকারি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে এবং কারিগাঁও পুলিশ চৌকিতে হামলার চেষ্টা চালায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ এবং পরে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশকর্মীসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হন। গোটা কোকরাঝাড় জেলায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। কোকরাঝাড় ও চিরাং জেলায় ইন্টারনেট ও মোবাইল ডেটা পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন।



