বরাক তরঙ্গ, ১৬ মার্চ, সোমবার,
মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক। তাই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম সব সময়ই মানুষের হৃদয়ের গভীরতম আবেগের সঙ্গে জড়িত। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি মাতৃভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ শুরু হয়েছিল ঐতিহাসিক ৫০১ ঘণ্টার রেল রুকো আন্দোলন—যা ভাষা অধিকারের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। সেদিন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে শামিল হয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু আন্দোলন দমনে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে এক মর্মান্তিক মোড় দেয়। প্রথমে লাঠিচার্জ এবং পরে পুলিশের গুলিচালনায় ঘটনাস্থলেই শহিদ হন বীরাঙ্গনা সুদেষ্ণা সিনহা। তার সঙ্গে আরও বহু আন্দোলনকারী আহত হন। সুদেষ্ণা সিনহা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা আন্দোলনের প্রথম মহিলা শহিদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
একজন নারীর এই আত্মত্যাগ কেবল একটি ব্যক্তিগত ত্যাগের গল্প নয়; এটি একটি ভাষা ও জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের প্রতীক। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই যে কতটা তীব্র ও আবেগময় হতে পারে, সুদেষ্ণা সিনহার শহিদ হওয়া তারই প্রমাণ। তার রক্তে রঞ্জিত সেই আন্দোলন আজও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজকে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আরও দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ করে রেখেছে।
সেই ঘটনার পর থেকেই প্রতি বছর ১৬ মার্চ তারিখটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের মানুষ গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে ‘ভাষা শহিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন। এই দিনটি কেবল অতীতের একটি বেদনাময় স্মৃতি নয়, বরং ভাষার মর্যাদা রক্ষার শপথ পুনর্নবীকরণের দিন।
আজকের দিনে যখন বিশ্বায়নের চাপে বহু আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশ আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। মাতৃভাষার স্বীকৃতি ও প্রাথমিক শিক্ষায় তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা শুধু একটি দাবিই নয়, এটি একটি ন্যায্য অধিকার।
সুদেষ্ণা সিনহার আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি মানুষের আত্মা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রতীক। তাই এই আত্মত্যাগের স্মৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার মর্যাদা অটুট রাখাই আমাদের সবার দায়িত্ব।
ভাষা শহিদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে তখনই, যখন আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে ও দৈনন্দিন জীবনে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারব। সুদেষ্ণা সিনহার আত্মবলিদান সেই পথেই আমাদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।



