বরাক তরঙ্গ, ৫ জানুয়ারি : মুম্বাই গিয়ে থিয়েটার প্রেমীদের মধ্যে সাড়া ফেলে এসেছে শিলচরের ভাবীকাল থিয়েটার গ্রুপ। ‘কোর্ট মার্শাল’ মঞ্চস্থ করে তাঁরা বহির্বরাকে জানিয়ে এলেন, কীভাবে ৪২ বছর পরও একটি নাট্য সংগঠন এমন মজবুত থাকতে পারে। বয়স, পেশা সহ নানা দিকে দুস্তর ব্যবধানের পরও কী করে প্রতিটি সদস্য পরস্পরের প্রতি আন্তরিক বন্ধনে আবদ্ধ রয়েছেন।
নবি মুম্বাইর বেঙ্গলি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন সিবিডির আয়োজিত ‘ফ্লেমিঙ্গো বাংলা নাট্যোৎসবে’ গত ২০ ডিসেম্বর ভাবীকালের ছিল তৃতীয় তথা শেষ নাটক। স্থানীয় দুই সুপরিচিত নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনা দেখেও দর্শকরা উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নাটক দেখার জন্য ঠায় বসেছিলেন। ভাবীকালের কুশীলবরা অবশ্য তাঁদের অপেক্ষার যথাযথ মর্যাদা দিয়েছেন। নাটক শেষে দর্শকরাই বলছিলেন পুষিয়ে দিয়েছে শিলচরের দলটি। এই নাটকটি না দেখলে একটা বড় কিছু মিস করতাম। তাঁরা ভাবীকালের নাটক আরও দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন বলেও মন্তব্য করেন। বিশেষ করে, এত দূরে থেকেও তাঁরা শান্তনু পাল নির্দেশিত ‘মনসামঙ্গলে’র কথা জানেন। আবদার জানিয়ে রাখেন, পঞ্চম ফ্লেমিঙ্গো নাট্যোৎসবে ‘মনসামঙ্গল’ই যেন নিয়ে যান।

অবাঙালি এক তরুণী খোলামেলা বললেন, আমি ভাষাটা বুঝতে পারিনি, তবু তাদের অভিনয় আমাকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত বসিয়ে রেখেছে। একইভাবে সেখানকার এক প্রবীণ নাট্যবোদ্ধা অকপটে বলে গেলেন যে, নাটকটিকে একেবারে সর্বোচ্চ সীমায় পৌছনোর জন্য যে প্রয়াসের প্রয়োজন, প্রতিটি কলাকুশলী তা প্রতি মুহূর্তে করে গিয়েছেন। শান্তনু পালের নির্দেশনার তারিফ করতে দেখা গেল ওই উৎসবে অভিনয় করতে যাওয়া অন্য নাট্যদলের বরিষ্ঠ সদস্যদেরও। বললেন, “ছয়-সাত বছর আগে আমরাও স্বদেশ দীপকের কোর্ট মার্শাল করেছিলাম, কিন্তু শান্তনু পাল যা করে দেখালেন, তা অসাধারণ। দেড়ঘন্টার নাটককে ৪৫ মিনিটে শেষ করা, চাট্টিখানি কথা নয়।” একঝাঁক অভিনয়পাগল তরুণ-তরুণীকে নাটকে দেখে ঈর্ষাবোধ করছিলেন তাঁরা, গোপন রাখেননি সে কথাও।
শিলচরের এক মহিলা দীর্ঘদিন ধরে মুম্বাইতে রয়েছেন, তিনি ভাবীকালের নাটক শুনেই মারাঠা সাহিত্য মন্দিরে ছুটে গিয়েছিলেন। বেরনোর সময় এতটাই উচ্ছ্বসিত যে, সকলকে বলছিলেন, “এত দিন পরেও ভাবীকাল আমাদের গর্ব।” আরেক জন নিজেকে করিমগঞ্জের ছেলে পরিচয় দিয়ে জানালেন, ১৯৮১ সাল থেকে তিনি শ্রীভূমি জেলার বহুরূপীর সদস্য হিসেবে অভিনয় করেছেন। ভাবীকালের কোর্ট মার্শাল দেখে তাঁর মন্তব্য, “অসাধারণ বললেও কম বলা হয়।”

আয়োজক সংগঠন ‘বেঙ্গলি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন সিবিডি’র ফেসবুক পেজে লেখা হয়েছে, “শিলচর আসামের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল হলেও শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গান, বাংলা নাটক, সুস্থ সাংস্কৃতিক নানা কাজে শিলচরের অধিবাসীরা শুধু আগ্রহী নন, তাঁরা সাধনা করেন। তাই তাঁরা সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নাটকের ক্ষেত্রে শুধু নাটক রচনা, পরিচালনা বা উপস্থাপনা নয়, নাটকের অন্যান্য বিষয়েও তাঁরা সমৃদ্ধ।
সুপরিচিত নাট্য ব্যক্তিত্ব শান্তনু পালের নির্দেশনায় এই নাটকের কুশীলবরা হলেন – পল্লব ভট্টাচার্য, সায়ন্তনী পাল (মিঠি), গৌরব রবিদাস, সৌম্য ( আকাশ) দাস, সুব্রত রায়, শিবম দাস, অনিন্দ্য সেন, দেবাশিস ভট্টাচার্য, ওঙ্কার ঘ্যাগ (মুম্বাই), নভনীল দাস, হাসানুর সরকার, তুষার বণিক এবং সংহিতা চানু। শান্তনু পাল এই নাটক শুধু পরিচালনা করলেন না, তিনি দাপটের সঙ্গে এই নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলেন। মুম্বাইয়ে শিলচরের কোনও নাট্যদলের এটিই প্রথম অভিনয়। আবির্ভাবেই তাঁরা দর্শকদের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। প্রমাণ করলেন, শিলচর কতটা সংস্কৃতি রসে সমৃদ্ধ। আমরা আবার তাঁদের অন্যান্য প্রযোজনা দেখতে চাই – দেখতে চাই তাঁদের আর এক প্রযোজনা ‘মনসামঙ্গল’।”



