বরাক তরঙ্গ, ১৯ জানুয়ারি, সোমবার,
বরাক উপত্যকায় গৌহাটি উচ্চ ন্যায়ালয়ের একটি সার্কিট বেঞ্চ অথবা স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের দাবি নতুন নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দাবি আজ আর কেবল আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং ন্যায়বিচারের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। কাছাড়, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দি—এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও সাংস্কৃতিকভাবে স্বতন্ত্র বরাক উপত্যকার মানুষের জন্য ন্যায়বিচার আজও দূরবর্তী গন্তব্য।
উচ্চ ন্যায়ালয়ে মামলা পরিচালনার জন্য বরাক উপত্যকার মানুষকে গৌহাটি যেতে হয়। এই যাত্রা দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। প্রবীণ নাগরিক, মহিলা, পেনশনভোগী এবং আর্থিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষের কাছে এই প্রক্রিয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, ন্যায়বিচারে কার্যকর প্রবেশাধিকার সীমিত হয়, যা সরাসরি সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—গৌহাটি উচ্চ ন্যায়ালয়ের মোট মামলার ৩০ শতাংশেরও বেশি আসে বরাক উপত্যকা থেকে। এত বিপুল মামলার উৎস হয়েও এই অঞ্চল আজও উচ্চ ন্যায়ালয় স্তরে নিজস্ব বিচারিক পরিকাঠামো থেকে বঞ্চিত। এটি শুধু বৈষম্যের উদাহরণ নয়, বিচার ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতারও প্রতিফলন।
রাজ্য সরকার প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বরাক ভ্যালি ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট গঠন, পৃথক সচিবালয় এবং লক্ষীপুরে সাব-ডিভিশনাল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্থাপন তার প্রমাণ। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি প্রশাসন ও নিম্ন আদালত স্তরে বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়, তাহলে উচ্চ ন্যায়ালয় স্তরে তা কেন নয়? বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে বিকেন্দ্রীকরণ না হলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার পূর্ণতা পায় না।
এই দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও জড়িত। ২০১৬ সালে প্রকাশিত বিজেপির “আসাম ভিশন ডকুমেন্ট (২০১৬–২০২৫)”-এ শিলচরে গৌহাটি উচ্চ ন্যায়ালয়ের একটি বেঞ্চ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হলেও সেই প্রতিশ্রুতি আজও বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে বরাক উপত্যকার মানুষের মধ্যে হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতি গভীর হয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা মানে কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়াত কবীন্দ্র পুরকায়স্থের দৃষ্টিভঙ্গি ও উত্তরাধিকারকেও সম্মান জানানো।
ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাও একটি বড় বাস্তব সমস্যা। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমীয়া সরকারি ভাষা হলেও বরাক উপত্যকায় বাংলা সরকারি ভাষা। গৌহাটিতে মামলা পরিচালনার সময় বাংলা ভাষাভাষী পক্ষ ও আইনজীবীদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। বরাক উপত্যকায় বেঞ্চ স্থাপন হলে ভাষাগতভাবে সহজ, স্বচ্ছ ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য বিচার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ভার্চুয়াল শুনানি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হলেও তা কখনও সরাসরি আদালতের পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না, বিশেষত জটিল ও সংবেদনশীল মামলায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সার্কিট বেঞ্চ স্থাপনের উদাহরণই প্রমাণ করে যে ন্যায়বিচারের জন্য শারীরিক উপস্থিতির গুরুত্ব আজও অপরিসীম।
সব মিলিয়ে, বরাক উপত্যকায় গৌহাটি উচ্চ ন্যায়ালয়ের একটি সার্কিট বেঞ্চ বা স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন জনস্বার্থে অত্যন্ত জরুরি। এতে মামলার জট কমবে, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে। এখন সময় এসেছে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান ঘোচানোর। ন্যায়বিচার যেন দূরের স্বপ্ন না হয়ে ওঠে—এই দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।



