বরাক তরঙ্গ, ৮ ফেব্রুয়ারি : দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সাংসদ গৌরব গগৈ এবং তাঁর পরিবার—বিশেষত স্ত্রী এলিজাবেথ কোলবার্ন গগৈয়ের পাকিস্তানের সঙ্গে সংযোগ সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। রবিবার দিসপুরের লোকসেবা ভবনে আয়োজিত এক বহুল প্রতীক্ষিত বিশেষ সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ সব তথ্য তুলে ধরেন।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ১০ সেপ্টেম্বর এসআইটি জমা দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে—গোপনীয় অংশ বাদ দিয়ে—এই তথ্যগুলি প্রকাশ করা হয়েছে। অসম পুলিশের সিআইডিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩-এর ধারা ৪৮/৬১/১৫২/১৯৭(১) এবং অবৈধ কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন, ১৯৬৭-এর ধারা ১৩(১)-এর অধীনে নথিভুক্ত মামলা নম্বর ০৫/২০২৫ অনুযায়ী তদন্ত চালিয়ে এসআইটি এই প্রতিবেদন জমা দেয়।
সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সিঙ্গাপুরে একটি সম্মেলনে থাকাকালীন তিনি সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি দেখেন, যেখানে সাংসদ গৌরব গগৈ একটি যুব প্রতিনিধি দলকে নিয়ে পাকিস্তান দূতাবাসে গিয়েছিলেন। প্রথমে ছবিটিকে ভুয়া মনে হলেও কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্যে নিশ্চিত হন যে ছবিটি সত্য। এরপরই বিষয়টি অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পাকিস্তানি নাগরিক আলি তৌকির শেখের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে আসে।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, রাজনীতির বিরোধিতা ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ এক বিষয় নয়। কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে বৈরী রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করার অভিযোগ সামনে এলে দেশের স্বার্থেই তদন্ত প্রয়োজন। তিনি জানান, গৌরব গগৈয়ের পাকিস্তান সংযোগ এখন আর কেবল সন্দেহের পর্যায়ে নেই; এসআইটি তদন্তে এই সন্দেহের ভিত্তি মিলেছে। বিষয়টি পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।
আলি তৌকির শেখ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তদন্তে জানা গেছে পাকিস্তানের প্রভাবশালী নাগরিক আলি তৌকির শেখের সঙ্গে গৌরব গগৈয়ের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আলি তৌকির শেখ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও আইএসআই-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ। তিনি ‘লিড পাকিস্তান’-এর প্রধান এবং ‘ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নলেজ নেটওয়ার্ক (সিডিকেএন)’-এর এশিয়া প্রধান ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে ভারতবিরোধী প্রচার ও সাম্প্রদায়িক উসকানিতে তাঁর ভূমিকার অভিযোগও তোলা হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এলিজাবেথ কোলবার্ন গগৈ ২০১১ সালে পাকিস্তানে গিয়ে ‘লিড পাকিস্তান’-এ যোগ দেন এবং সেখানে চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। পরবর্তীতে দিল্লিতে ‘লিড ইন্ডিয়া’-তে কাজ করলেও তাঁর বেতন পাকিস্তান থেকেই দেওয়া হতো বলে অভিযোগ। এ ক্ষেত্রে বিদেশি অনুদান গ্রহণ সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের আশঙ্কা প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আরও জানান, বিয়ের পরও এলিজাবেথ কোলবার্ন গগৈ ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ও খ্রিস্টান ধর্মেই রয়ে গেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত গৌরব গগৈ অত্যন্ত গোপনে পাকিস্তানে ছিলেন। সে সময় তাঁর বাবা অসমের মুখ্যমন্ত্রী হলেও অসম গোয়েন্দা বিভাগকে এ সফরের বিষয়ে জানানো হয়নি। তাঁর ভিসা পরিবর্তন ও পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে যাতায়াত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, ওই সফরের সময় গৌরব গগৈ সম্পূর্ণ ডিজিটাল নীরবতায় ছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী সন্দেহ প্রকাশ করেন, ওই ১০ দিনের সফর কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তিনি গৌরব গগৈকে ওই সময়ের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করার আহ্বান জানান।
এছাড়া তিনি বলেন, গৌরব গগৈয়ের চার সদস্যের পরিবারের তিনজনই ব্রিটিশ নাগরিক—যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এলিজাবেথ কোলবার্ন গগৈয়ের ভিসা বাতিলের জন্য ভারত সরকারকে আবেদন জানানো হবে। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী অতুল বরা, কেশব মহন্ত, অজন্তা নেওগ, চন্দ্রমোহন পাটোয়ারি, প্রশান্ত ফুকন ও পীযূষ হাজরিকা।



