হাইলাকান্দি রোডে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ উপলক্ষে হিন্দু সম্মেলন

দীপ দেব, শিলচর।
বরাক তরঙ্গ, ৭ জানুয়ারি : রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস)-র শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে দেশব্যাপী চলমান হিন্দু সম্মেলনের অঙ্গ হিসেবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শহরের হাইলাকান্দি রোডের শুভশ্রী বিবাহ ভবনে এক প্রাঞ্জল হিন্দু সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পদাধিকারী, সমাজসেবী ও ভক্তবৃন্দের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানে ছিল গম্ভীর ও আধ্যাত্মিক আবহ। অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে ভারতমাতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং পঞ্চপ্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রীয় সেবা ভারতীর দক্ষিণ আসাম প্রান্তের সভাপতি শুভ্রাংশু শেখর ভট্টাচার্য, রাষ্ট্র সেবিকা সমিতির দক্ষিণ আসাম প্রান্তের প্রচারিকা সুপর্ণা দে, শিলচর শঙ্করমঠ ও মিশনের কর্মাধ্যক্ষ শ্রীমৎ বিজ্ঞানানন্দ ব্রহ্মচারী মহারাজ, আয়োজক কমিটির সভাপতি অসীম পুরকায়স্থ এবং ইস্কন শিলচর শাখার শ্রীপাদ নিমাই গোবিন্দ বাবাজি প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।স্বাগত ভাষণে আয়োজক কমিটির সভাপতি অসীম পুরকায়স্থ হিন্দু সমাজের সামাজিক ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির প্রেক্ষাপটে সামাজিক উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, সামাজিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় উৎসব কেবল আচার–অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজকে একতাবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন অতিথি বক্তা হিন্দু সমাজের বর্তমান প্রেক্ষাপট, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে মতামত ব্যক্ত করেন। শিলচর শঙ্করমঠ ও মিশনের কর্মাধ্যক্ষ বিজ্ঞানানন্দ ব্রহ্মচারী মহারাজ তাঁর বক্তব্যে হিন্দু সমাজের আত্মরক্ষা, ঐক্য এবং প্রয়োজনে শাস্ত্রের পাশাপাশি অস্ত্র ধারণের মানসিক প্রস্তুতির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি হিন্দুদের আধ্যাত্মিক শক্তি ও সাধু-সন্তদের ত্যাগের ঐতিহ্য স্মরণ করে তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান।ইস্কনের শ্রীপাদ নিমাই গোবিন্দ বাবাজী ভারতবর্ষকে ‘পবিত্র ভূমি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এদেশে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তি আধ্যাত্মিকভাবে অমৃতের সন্তান। তাই হিন্দুদের দুর্বল মানসিকতা ত্যাগ করে সর্বক্ষেত্রে—আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক জীবনে—নিজেদের শক্তিশালী করে তোলার প্রয়োজন আছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

রাষ্ট্র সেবিকা সমিতির প্রচারিকা সুপর্ণা দে তাঁর বক্তব্যে সনাতন ভারতের বৈজ্ঞানিক স্বরূপ ও প্রাচীন ভারতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান–বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও দার্শনিক চিন্তাধারা আজও প্রাসঙ্গিক, এবং আধুনিক যুগে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে সনাতন নীতি ও মূল্যবোধ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি।রাষ্ট্রীয় সেবা ভারতীর দক্ষিণ আসাম প্রান্তের সভাপতি শুভ্রাংশু শেখর ভট্টাচার্য্য তাঁর বক্তৃতায় হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও বিরোধ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, হিন্দুদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের অভাবই নানা সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। ভাই–ভাই, বন্ধু–বন্ধু, প্রতিবেশী এবং বিভিন্ন গুরু–ভক্ত গোষ্ঠীর মধ্যে অকারণ বিরোধ না তৈরি করে একে–অপরের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘকে দেশের সর্বাঙ্গীন সেবামূলক ও অগ্রগতিমুখী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে হিন্দু সমাজকে সংঘবদ্ধ করার প্রয়াসকে আরও বেগবান করার অনুরোধ জানান।পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ধর্মীয় পরিবেশের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আবহও বিরাজমান ছিল। স্থানীয় সঙ্গীতশিল্পী ও নৃত্যশিল্পীরা ভক্তিমূলক সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন, যা উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলীর মন জয় করে। অনুষ্ঠানটি সুশৃঙ্খলভাবে সঞ্চালনা করেন জয়া আচার্য্য।শেষ পর্বে বিজ্ঞানানন্দ ব্রহ্মচারী মহারাজের সংকল্প বাক্য পাঠ ও সমবেত প্রার্থনার মধ্য দিয়ে হিন্দু সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষকে সামনে রেখে আগামী দিনগুলোতেও এই ধরনের ধর্মীয়–সামাজিক সচেতনতা মূলক অনুষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *