শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন কাছাড় জেলা প্রশাসনের
জনসংযোগ, শিলচর।
বরাক তরঙ্গ, ১৭ জানুয়ারি : আসামের সাংস্কৃতিক নবজাগরণের রূপকার রূপকোঁওর জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে শিল্পী দিবস পালন করল কাছাড় জেলা প্রশাসন। জেলা সাংস্কৃতিক পরিক্রমা বিভাগের সহযোগিতায় জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়ের নতুন সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই স্মরণানুষ্ঠানে শিল্পী জ্যোতিপ্রসাদের বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক ও চলচ্চিত্র এই চারটি ক্ষেত্রেই যাঁর অনবদ্য অবদান আধুনিক অসমিয়া সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে তুলেছে, সেই কিংবদন্তি শিল্পীর জীবন ও কর্মকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন কাছাড়ের জেলা উন্নয়ন আয়ুক্ত রাজীব রায়। যিনি প্রধান অতিথি হিসেবেও উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সহকারী আয়ুক্ত অঞ্জলি কুমারী, সহকারী আয়ুক্ত ও ভারপ্রাপ্ত উপ সঞ্চালক তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের আঞ্চলিক কার্যালয় শিলচর, জেলা সাংস্কৃতিক পরিক্রমা বিভাগের শাখা আধিকারিক দীপা দাস, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন আধিকারিক স্নেহাংশু রায়, জ্যেষ্ঠ জেলা আধিকারিকবৃন্দ, সাংস্কৃতিক পরিক্রমা বিভাগের প্রতিনিধিরা, শিক্ষাবিদ, ছাত্রছাত্রী, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।

সভায় সভাপতির ভাষণে রাজীব রায়, রূপকোঁওর জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালাকে “সৃজনশীল জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত” হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, জ্যোতিপ্রসাদের শিল্পচর্চা কেবল নান্দনিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা সমাজজাগরণ, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। তিনি তরুণ প্রজন্মকে রূপকোঁৱৰ-এর জীবনাদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার আহ্বান জানান এবং আসামের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
অনুষ্ঠানে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আশরাফ হুসেন এক প্রাঞ্জল বক্তৃতায় রূপকোঁওর জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার জীবনপথ ও শিল্পীসত্তার বিকাশ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, পরমানন্দ আগরওয়ালা ও কিরণময়ী দেবীর ঘরে জন্ম নেওয়া জ্যোতিপ্রসাদ শৈশব থেকেই সাহিত্য, সংগীত ও চিত্রকলার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন এবং বহুবিধ বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করে আধুনিক অসমিয়া সাংস্কৃতিক চেতনার রূপকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অধ্যাপক হুসেন আরও বলেন, সামাজিক ও জাতীয় চেতনায় প্রোথিত থাকার কারণেই রূপকোঁৱৰ-এর সৃষ্টিকর্ম আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রাসঙ্গিক। গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যোগেশ্বর বর্মন তাঁর বক্তব্যে রূপকোঁৱৰ জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার অসমীয়া সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও চলচ্চিত্রে অতুলনীয় অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রূপকোঁওর কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি নিজেই এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যিনি শিল্পের উৎকর্ষকে সমাজসেবার উদ্দেশ্যের সঙ্গে নিপুণভাবে মেলাতে পেরেছিলেন।

এর আগে স্বাগত ভাষণে দীপা দাস, রূপকোঁওর জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার দর্শনের চিরকালীন প্রাসঙ্গিকতার কথা উল্লেখ করে বলেন, সাংস্কৃতিকভাবে জাগ্রত ও সামাজিকভাবে সচেতন আসামের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
অনুষ্ঠানকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক কার্যালয় শিলচরের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের সাংস্কৃতিক শাখার প্রাক্তন ম্যানেজার ও প্রযোজক নিপু শর্মার নেতৃত্বে স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশিত সুমধুর জ্যোতি সঙ্গীত। শিল্পীদের তবলায় যোগ্য সহযোগিতা করেন প্রখ্যাত তবলা শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক, ভাস্কর দাস। এদিন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি শিল্পীদের মধ্যে, নিপু শর্মা, পল্লবী দাস ও সুরমিতা আচার্য এককভাবে জ্যোতি সঙ্গীত পরিবেশন করে অনুষ্ঠানকে শ্রুতিমধুর করে তোলেন। এই সংগীতানুষ্ঠান সমগ্র অনুষ্ঠানে এক গভীর আবেগ ও নান্দনিক সৌন্দর্য যোগ করে।
অনুষ্ঠান উপলক্ষে বক্তারা সম্মিলিতভাবে কবি, নাট্যকার, গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে রূপকোঁওর জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার অমর উত্তরাধিকারকে স্মরণ করেন যাঁর শিল্পের মাধ্যমে অসমিয়া পরিচয় লালন ও বিকাশের আজীবন সাধনা আজও সময়ের সীমানা অতিক্রম করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।



