সেনা দিবসের শ্রদ্ধা থেকে সড়ক নিরাপত্তার শপথ
বরাক তরঙ্গ, ১৫ জানুয়ারি : সীমান্তে যে শৃঙ্খলা দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, সেই শৃঙ্খলাই যদি প্রতিদিনের রাস্তায় প্রতিফলিত হয়, তবে প্রাণহানির এই নীরব যুদ্ধ থামানো সম্ভব এই বার্তাকে সামনে রেখেই ভারতীয় সেনা দিবসের পবিত্র সকালে মাছিমপুর মিলিটারি স্টেশন থেকে এক ব্যতিক্রমী সড়ক নিরাপত্তা জনআন্দোলনের সূচনা হল। শিলচর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উড়িয়ে শুরু করেন ‘পথের বার্তা পথে যাত্রা’ কর্মসূচি। ১৫ জানুয়ারি ভারতীয় সেনা দিবস এই দিনটি দেশের সার্বভৌমত্ব, আত্মত্যাগ ও শৃঙ্খলার প্রতীক। সেই ঐতিহ্যের আবহেই মাছিমপুর মিলিটারি স্টেশন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান। উপস্থিত সেনা জওয়ানদের হাতে ফুলাম গামোছা তুলে দিয়ে সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য বলেন, সেনাবাহিনীর নিরলস ত্যাগের কারণেই দেশের প্রতিটি নাগরিক শান্তি ও স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সেই শৃঙ্খলা যদি আমাদের রাস্তায় না আসে, তবে অসতর্কতা প্রতিদিন প্রাণ কেড়ে নেবে।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সড়ক নিরাপত্তা কোনও একক দপ্তরের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিক দায়বদ্ধতা ও সামাজিক সচেতনতার বিষয়।
এই বার্তাকে সামনে রেখেই মাছিমপুর মিলিটারি স্টেশন থেকে শুরু হয় মেগা বাইক র্যালি। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা মাস ২০২৬ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গড়করির আহ্বানে দেশজুড়ে যে সচেতনতা অভিযানের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তারই অংশ হিসেবে শিলচর লোকসভা কেন্দ্রে এই দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এই অভিযানের অন্যতম বিশেষ দিক হল—৬৮ বছর বয়সে সাংসদ নিজে বাইক চালিয়ে ১৬২টি গ্রাম পঞ্চায়েত, তিনটি পুর এলাকা ও একটি পুর নিগম পরিক্রমা করে সড়ক নিরাপত্তার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সাংসদের কথায়, “জনপ্রতিনিধির কথা তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন তিনি নিজে সেই পথে চলেন।”

ভারতে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, প্রতি বছর দেশে প্রায় ১.৭ লক্ষ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। নিহতদের অধিকাংশই ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ, যার ফলে পরিবার বিপর্যস্ত হয় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ ক্ষতি হয়। তিনি এই পরিস্থিতিকে “নীরব মহামারী” বলে অভিহিত করে জানান, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধই এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান অস্ত্র। এই মাসব্যাপী অভিযানে শিলচর লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিটি প্রান্তে সচেতনতা বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্কুল-কলেজ, সরকারি দপ্তর, বাজার ও জনসমাগমস্থলে প্রচার চালানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনাকালে প্রাথমিক চিকিৎসা, জীবনরক্ষাকারী কৌশল এবং গুড সামারিটান আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৩–২৪ সালে অসমের ৩৫টি জেলায় সফলভাবে পরিচালিত ‘পথ সুরক্ষা জন আন্দোলন’-এর অভিজ্ঞতাই এই কর্মসূচির ভিত্তি বলে জানান সাংসদ। অভিযান শেষে দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক ও মোড় চিহ্নিত করে একটি বিশদ প্রতিবেদন তৈরি করে তা কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রকে পাঠানো হবে বলেও তিনি জানান।
র্যালির প্রথম দিনে বাইক বহর কুমারপাড়া নিজজয়নগর গ্রাম পঞ্চায়েত, কৃষ্ণপুর-ভৈরবনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের রানিঘাট সেতু, তারাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের রাখাল খালের পাড়, অম্বিকাপুর ও বদরপুর–মাসিমপুর গ্রাম পঞ্চায়েত পরিক্রমা করে শিলচর শহরের সদরঘাট, রেলস্টেশন চত্বর, ন্যাশনাল হাইওয়ে বাজার, আশ্রম রোড ও রাঙ্গিরখাড়ি সঞ্জয় মার্কেট-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে শিলচর পৌর নিগমের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পৌঁছয়। পথে পথে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই উদ্যোগকে আরও অর্থবহ করে তোলে।



