।। বিভূতিভূষণ গোস্বামী ।।
(এডিটর, মিজোরাম পোস্ট)
১৩ জানুয়ারি : কবীন্দ্র পুরকায়স্থের প্রয়াণে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতির একটি নির্লিপ্ত অথচ দীপ্ত অধ্যায়ের অবসান ঘটলো । তিনি এমন এক সময়ের রাজনীতিক, যখন ভারতীয় জনতা পার্টির বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো নির্মিত হচ্ছিল দিল্লিকেন্দ্রিক মতাদর্শী ত্রয়ী—অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি এবং মুরলীমনোহর যোশির হাত ধরে। সেই পরিসরের মধ্যেই কবীন্দ্র পুরকায়স্থের অবস্থান ছিল উত্তরপূর্বের গৈরিক রাজনীতির স্রোতের এক মর্যাদাপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে। হয়তো সে সময় এই অঞ্চলের গেরুয়া রাজনীতি ছিল কম উচ্চকিত, কিন্তু কবীন্দ্রবাবুর ধারাবাহিকতা ছিল বিশ্বাসযোগ্য। বাঙালি-প্রধান বরাক উপত্যকাকে কেন্দ্র করে গোটা অসম এবং সংবেদনশীল উত্তরপূর্বাঞ্চলে গেরুয়া বসন্তকে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব এক নীরব প্রতিজ্ঞার মতো পালন করেছেন, গড়ে দিয়ে গেছেন উত্তর-প্রজন্মের জন্য এক মজবুদ মঞ্চের ভিত।
শিক্ষকতা থেকে রাজনীতিতে আসা কবীন্দ্রবাবুর মৌলিক জীবনধারাই ছিল শৃঙ্খলা ও সংযম। বক্তৃতায় তিনি কখনওই বাগ্মিতার আতিশয্য দেখাননি। তাঁর ভাষণ ছিল তথ্যনির্ভর, যুক্তিবদ্ধ, প্রায়শই নিরাভরণ। এই দিক থেকে তিনি তাঁর সমসাময়িক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সন্তোষমোহন দেব-এর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করতেন। সন্তোষবাবুর ভাষণে ছিল শাণিত ব্যঙ্গ, তীক্ষ্ণ রসিকতা ও জনতাকে মুহূর্তে টেনে নেওয়ার ক্ষমতা; কবীন্দ্রবাবুর বক্তৃতা সেখানে ধীরস্থির—কিন্তু বিশ্বাস জাগানো। জনসভায় হাসির ফোয়ারা না ছুটলেও, তাঁর বক্তব্য শ্রোতাকে ভরসা দিত যে রাজনীতি কেবল চমক নয়, ধারাবাহিক দায়িত্বও।
এই সংযত স্বভাবের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর ‘সফট হিন্দুত্ব’। উত্তর-পূর্বের বহুস্তরীয় সমাজে যেখানে ধর্মীয় পরিচয় রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, কবীন্দ্র পুরকায়স্থ সেখানে বিশ্বাস করতেন সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতায় আগ্রাসনে নয়। তাঁর হিন্দুত্ব ছিল আচরণে, অনুশীলনে; শ্লোগানে নয়। ফলে বিজেপির আদর্শের সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি সমাজের নানা স্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। এই গ্রহণযোগ্যতাই তাঁকে স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
দিল্লির রাজনীতিতে তিনি কখনও কেন্দ্রীয় চরিত্র হননি এ কথাও সত্য। কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব তাঁর জন্য ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, ছিল সেতুবন্ধন। উত্তর-পূর্বের প্রশ্ন, সীমান্তাঞ্চলের সংবেদনশীলতা, এই বিষয়গুলিকে তিনি দিল্লির টেবিলে তুলেছিলেন নির্লোভ ভঙ্গিতে। দলীয় রাজনীতির ভিতরে থেকেও তিনি বরাক উপত্যকার স্বার্থের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন, যা আজকের রাজনীতিতে বিরল। মন্ত্রী হিসেবে টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার তথা আধুনিকীকরণে তাঁর অবদান দেশ মনে রাখবে।
পাঠক জানেন, রাজনীতিতে উচ্চস্বরে উচ্চারণই সব নয়। কবীন্দ্র পুরকায়স্থের জীবনী সেই নীরব সত্যেরই প্রমাণ। তিনি ছিলেন না জনতার উচ্ছ্বাসের নায়ক; ছিলেন স্থায়িত্বের প্রতিনিধি। তাঁর প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতির ইতিহাস শুধু বজ্রনিনাদে লেখা হয় না, কখনও কখনও তা লেখা হয় শান্ত কণ্ঠের আত্মবিশ্বাসের ধারাবাহিকতায়।



