বরাক তরঙ্গ, ৪ এপ্রিল : ভিজুয়াল পারফরম্যান্স সমকালীন শিল্পের এক অভিনব মাধ্যম, যেখানে মানবদেহই শিল্পের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেহ ও তার পারিপার্শ্বিক উপাদান—জীবিত বা জড়—নির্দিষ্ট স্থান ও পরিসরে নিজস্ব ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে একেকটি স্বতন্ত্র রূপ ধারণ করে। গত বৃহস্পতিবার সেই অভিনব শিল্পের পরিবেশনা ‘লিভিং ডাই’ মুগ্ধ করলো দর্শকশ্রোতাদের।
বিপিনচন্দ্র পাল অডিটোরিয়ামে ভিজুয়াল আর্টস বিভাগের উদ্যোগে এই ভিজুয়াল পারফরম্যান্স উপস্থাপন করে ‘পেইন প্লেয়ার্স’ পারফরম্যান্স গ্রুপ। পরিচালনায় ছিলেন বিভাগের অধ্যাপক অভিব্রত চক্রবর্তী। তিনি জানান, গত দুই দশক ধরে তিনি এই ধারাকে পশ্চিমী প্রভাব থেকে পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন। সেই প্রচেষ্টায় সংলাপ, বিচ্ছিন্ন ন্যারেটিভ, কোরিওগ্রাফি, সমবেত উচ্চারণ, আলো-ছায়া প্রভৃতি উপাদানকে একত্রিত করে ভিজুয়াল ও থিয়েট্রিক্যাল ভাষার মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে।

‘লিভিং ডাই’ সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট কাহিনি উপস্থাপন না করলেও জীবন, শরীর ও সামাজিক সংঘাতের নানা টুকরো চিত্রকে কোলাজ আকারে তুলে ধরে। সংলাপ ও উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা এবং মানব অস্তিত্বের অনিশ্চয়তার দিকটিও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এই পারফরম্যান্সের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর মুক্ত পরিসর ব্যবহার। মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে প্রেক্ষাগৃহের বিভিন্ন স্থান—মঞ্চ, সিঁড়ি, দর্শকাসন, এমনকি প্রবেশদ্বার—জুড়ে শিল্পীরা উপস্থাপনা করেন, যা দর্শকদের এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে। শেষে ছিল সমস্ত বাধা অতিক্রম করে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং সম্মিলিত মানবিক অস্তিত্বের উদযাপন।
এদিনের এই পারফরম্যান্সের সহযোগিতায় ছিলেন গবেষক কিরণ সিনহা ও ছাত্র অরিজিৎ। অভিনয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নন্দিনী দেব, ঋদ্ধিমা নাথ, দিগঙ্গনা দাস, কিরণ সিনহা প্রমুখ। এছাড়াও এতে অংশ নেন অন্তরা রাজকুমারী, রিতিকা থাপা, ত্রিদিশা দত্ত, স্বাতি কুমারী, প্রেরণা সিনহা, নির্বাণ সিনহা, শিবম দাস, কুশল সিংহ, জয়শ্রী কলিতা, কে. নাওমে, সিদ্ধার্থ রবিদাস, বিপ্রজিত দেব, গ্রেনল্ড মারউইন, বেদস্মিতা নাথ, সঞ্চিতা নন্দী, পর্ণশ্রী চক্রবর্তী, মানবী পাল, জুহি সিংহ। আলোকচিত্রে ছিলেন অক্ষয় দে। সমগ্র প্রযোজনার ব্যবস্থাপনায় গবেষক তাবা ইয়ানিয়া, রেশমি দেবী ও প্রসেনজিৎ সাহা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে এক সংক্ষিপ্ত সংবর্ধনা পর্বে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক অশোক সেন, স্কুল অব ক্রিয়েটিভ আর্ট ও কমিউনিকেশন স্টাডিজের ডিন অধ্যাপক নির্মল কান্তি রায় এবং বরাক উপত্যকার বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব সুব্রত রায় ও শান্তনু পাল। তাঁদের উত্তরীয় ও স্মারক দিয়ে সম্মানিত করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৬ সালে বরাক উপত্যকায় ‘চিতা ভি পিতা হ্যায়’ শিরোনামে ভিজুয়াল পারফরম্যান্সের সূচনা করেন অভিব্রত চক্রবর্তী। পরবর্তীতে ‘সেই সব রক্তকরবীরা’, ‘ওয়ার উইদাউট গান’, ‘বিসর্জন’ প্রভৃতি প্রযোজনার ধারাবাহিকতায় ‘লিভিং ডাই’ সেই সৃজনযাত্রার সর্বশেষ সংযোজন।



