বরাক তরঙ্গ, ১২ মার্চ : আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ দফতরের উদ্যোগে ‘উত্তর–পূর্ব ভারত ও তার বাইরের সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধনে ভূপেন হাজরিকার ভূমিকা : পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক দু’দিনের আন্তর্জাতিক সেমিনার বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। প্রেমেন্দ্র মোহন গোস্বামী সভাকক্ষে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সেমিনারে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সমালোচক দিগন্ত বিশ্ব শর্মা।
অধ্যাপক দীপেন্দু দাসের পৌরোহিত্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য পেশ করেন সেমিনারের অন্যতম সমন্বয়ক তথা ডিন অব স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার অধ্যাপক অনুপ কুমার দে। তিনি ভূপেন হাজারিকার অসামান্য সৃষ্টিশীলতা ও মানবতাবাদী দর্শনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভূপেন হাজরিকা তাঁর সংগীত, সাহিত্য ও চিন্তার মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন।
প্রধান বক্তা বিশিষ্ট সমালোচক দিগন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ভূপেন হাজরিকা ছিলেন একাধারে শিল্পী, চিন্তক ও মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব। তাঁর গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; বরং তা মানুষের মুক্তি, সাম্য, ন্যায়বোধ ও সামাজিক সম্প্রীতির এক শক্তিশালী বার্তা বহন করেছে। তিনি আরও বলেন, ব্রহ্মপুত্রের তীর থেকে আন্তর্জাতিক পরিসর পর্যন্ত ভূপেন হাজারিকার শিল্প ও চিন্তা মানুষের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
অনুষ্ঠানে সাহিত্যিক অর্পিতা রানি দাসের রচিত “যাযাবরের কন্ঠ : সময়, সমাজ ও মানবতার প্রেক্ষিত” শীর্ষক একটি গ্রন্থেরও আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করা হয়। গ্রন্থটি মূলত ভূপেন হাজরিকার জীবনের অভিজ্ঞতা, জীবনবোধ এবং সমাজ–সংস্কৃতির নানা দিককে সাহিত্যিক ভাষায় তুলে ধরার এক অনন্য প্রচেষ্টা। উপস্থিত বক্তারা গ্রন্থটির সাহিত্যিক তাৎপর্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই ধরনের সাহিত্যকর্ম পাঠকের চিন্তাকে নতুন দিকনির্দেশ দেয় এবং সমকালীন বাংলা সাহিত্যে একটি ভিন্নমাত্রা যোগ করে।
সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক দীপেন্দু দাস ভূপেন হাজরিকার সাংস্কৃতিক দর্শন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভূপেন হাজারিকা উত্তর–পূর্ব ভারতের সংস্কৃতিকে বৃহত্তর ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন এবং তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন রচনায় অনুপ্রেরণা জোগায়।
অনুষ্ঠানের শেষে ধন্যবাদ সূচক বক্তব্য প্রদান করেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বরুণজ্যোতি চৌধুরী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে এই সেমিনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক বিনিময়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে ভূপেন হাজারিকার জীবন ও কর্ম নিয়ে আরও গবেষণার পথ উন্মুক্ত করবে।
দুপুরে আয়োজিত হয় প্ল্যানারি সেশন। এতে পৌরোহিত্য করেন ডিন, অ্যাকাডেমিক্স অধ্যাপক চিররঞ্জন ভট্টাচার্য। বক্তা হিসেবে ছিলেন স্কুল অব ইংলিশ অ্যান্ড ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজের ডিন অধ্যাপক অনিন্দ্য শ্যাম চৌধুরী। তিনি ভূপেন হাজরিকার সাংস্কৃতিক ভাবনা ও মানবিক দর্শনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
অধ্যাপক অনুপকুমার দে-র পৌরোহিত্যে আয়োজিত বিদ্যায়তনিক অধিবেশনে বিভিন্ন গবেষক ও শিক্ষাবিদ ভূপেন হাজরিকার সঙ্গীত, সাহিত্য, সমাজচিন্তা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়ে তাঁদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন ড. রীতামনি চুতিয়া, অদিতি চট্টোপাধ্যায়, আলকানন্দা পাল, জয় পাল, চিন্ময়ী শইকিয়া, অঙ্কিতা দাস প্রমুখ। বিকেলে আয়োজিত বিশেষ অধিবেশনে পৌরোহিত্য করেন অধ্যাপক বিশ্বতোষ চৌধুরী।

উল্লেখ্য, দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সেমিনারে বিভিন্ন শৈক্ষিক অধিবেশন, আলোচনা এবং গবেষণাপত্র উপস্থাপনার মাধ্যমে ভূপেন হাজারিকার জীবন, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং সাংস্কৃতিক দর্শনের নানা দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। আয়োজকদের মতে, এই সেমিনার ভূপেন হাজরিকার বহুমাত্রিক অবদানকে নতুনভাবে মূল্যায়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংলাপ ও শৈক্ষিক বিনিময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করেছে।



