বরাক তরঙ্গ, ২১ ফেব্রুয়ারি : আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন ও জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি এগেনস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচারাল অ্যাগ্রেশনের যৌথ উদ্যোগে শিলচর গোপালগঞ্জ হিউমিনিটি ফাউন্ডেশন অফিস প্রাঙ্গনে উভয় সংস্থার সভাপতি শিহাব উদ্দিন আহমদ ও নির্মলকুমার দাসের সভাপতিত্বে একটি মনোগ্য আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার প্রথমে মাতৃভাষার অস্থায়ী শহিদ বেদীতে মাল্যদান ও পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করে শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
সভাপতি মণ্ডলীর অন্যতম শিহাব উদ্দিন আহমদ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। অন্যতম সভাপতি নির্মলকুমার দাস উপস্থিত সবাইকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোকে ভাষিক সংখ্যালঘুদের মাতৃভাষার বর্তমান অবস্থান, আধিপত্য বাদের শিকার ও উত্তরণের পথ এই বিষয়বস্তুর উপর গুরুত্ব আরোপ করে আলোচনা করার আহ্বান জানান।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করে, সাদিক আহমেদ লস্কর বলেন, বর্তমানে কিভাবে বাষিক সংখ্যা লঘুদের ভাষা সংস্কৃতি আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে উদাহরণ তুলে ধরে প্রসঙ্গক্রমে বলেন, বর্তমানে দেশের অন্যান্য স্থানের সঙ্গে সংগতি রেখে বিশেষ করে আসামে বাংলা ভাষিক মানুষের উপর যে আক্রমণ চলছে তার থেকে পরিত্রাণের জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া কোন বিকল্প নেই। সনজিত পাল তার বক্তব্যে আঞ্চলিকভাবে অসমিয়া ভাষা ও কেন্দ্রীয়ভাবে হিন্দি ভাষার আধিপত্যের শিকার ভাষিক সংখ্যা লঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হলে গ্রামেগঞ্জে সচেতনতা সভার আয়োজন করাপ্রয়োজন।
জাকালকার সেক্রেটারি জেনারেল এম শান্তিকুমার সিংহ তার বক্তব্যে বলেন যে, আধিপত্যকারীদের ষড়যন্ত্রের শিকার প্রতিটি ভাষিক সংখ্যালঘু আজ বিভাজনের শিকার। তাই মাতৃভাষায় শিক্ষার লাভ সহ প্রচার ও প্রসারের স্বার্থে প্রতিটি বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন আজকের আহ্বান। বাংলা ভাষার আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী এবং ভাষাবিদ আবিদ রাজা মজুমদার, বরাক উপত্যকায় ১৯৬১ এর বাংলা ভাষার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে, এই আন্দোলনে বিভিন্নভাষীর জনগোষ্ঠীর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানের কথা উল্লেখ করে এটাকেই ভবিষ্যতের পাথেয় হিসাবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান। নেহারুল আহমেদ মজুমদার তার বক্তব্যে বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের আলোকে ১৯৬১ বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার তথা মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে যে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার ফলশ্রুতিতে যদিও বরাক উপত্যকার প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অধিকার লাভ আমরা করেছি কিন্তু বাস্তবে আজও তার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই না। তাই এ ব্যাপারে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে।
বিবেক আচার্জি তার বক্তব্যে শিলচর রেলস্টেশনকে ভাষা শহিদ স্টেশনের নামকরণ আজও সম্ভব হয়নি, এটা আমাদের ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেন। এবং ঐক্যবদ্ধভাবে এই দাবি পূরণে আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
ফরিদুল আহমেদ লস্কর তার বক্তব্যে কীভাবে ভার্ষিক সংখ্যালঘুদের ভাষা সংস্কৃতি, ও সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে চলেছে। বর্তমানে ভাষা সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করার কাজ ধরান্বিত করছে সেটা বিশদভাবে তুলে ধরেন। এছাড়া প্রাসঙ্গিক বক্তব্য রাখেন নবদ্বীপ দাস, আলিমুদ্দিন মজুমদার ও আফতাব উদ্দিন লস্কর প্রমুখ। ধন্যবাদ সূচক বক্তব্য রাখতে গিয়ে সভাপতি নির্মলকুমার দাস বলেন, ১৯৫২ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার আন্দোলন এবং ৬১তে বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার আন্দোলনের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সেটা আমাদের বুঝতে হবে। তিনি বলেন যে স্বাধীনতা স্বাধিকার ও স্বদেশপ্রেম ভাষা ও সংস্কৃতি চিরন্তন। এসবের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য মানুষ অতীতে আপসহীন লড়াই করেছে- করছে এবং করতে থাকবে। তাই আমাদেরও সে পথ অনুসরণ করতে হবে। এ কথা বলে উপস্থিত সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে সভায় সর্বসম্মতি ক্রমে গৃহীত নিম্নলিখিত প্রস্তাব পাঠ করে শুনানো হয়। শিলচর রেলস্টেশন কে ভাষা শহিদ স্টেশন হিসেবে অবিলম্বে নামকরণ করতে হবে, প্রতিটিভাষিক সংখ্যালঘু জাতি জনগোষ্ঠীর মানুষের নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা সহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। বর্তমানে অসম রাজ্য সহ অন্যান্য রাজ্যে বাসিক সংখ্যালঘুদের উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সহ তাদের ভাষা সংস্কৃতির সাংবিধানিক সম্মত সমান অধিকার ও মর্যাদা দিতে হবে।” তারপর সভার কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।


