দীপ দেব, শিলচর।
বরাক তরঙ্গ, ২৫ জানুয়ারি : রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে শিলচরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের তারাপুর আনন্দ পরিষদের মাঠে এক জমকালো হিন্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সনাতন ধর্মের গভীর দর্শন, হিন্দুত্বের ঐক্য এবং জীবনশৈলীর উপর বিস্তারিত আলোচনায় হাজারো অনুরাগী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এই সম্মেলন স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দু জাগরণের এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।সম্মেলনের সূচনা হয়েছে শিলচরের বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তীসহ বিশিষ্ট অতিথিদের দ্বারা ভারতমাতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে। এরপর সকল মূল্যবান বক্তা ও অতিথিদের গলায় উত্তরীয় পরানো হয় এবং হাতে শিবাজীর জীবনী সংক্রান্ত বই তুলে দেওয়া হয় সম্মান সূচক।সভাপতিত্ব করেন প্রবাল দেব। মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের উত্তর-পূর্ব ভারতের সংগঠক স্বামী সাধনানন্দজী মহারাজ এবং শিলচর শাখার অধ্যক্ষ স্বামী গুনসিন্ধুজী মহারাজ। আরএসএস-এর দক্ষিণ আসাম প্রান্তের প্রান্ত প্রচারক গৌরাঙ্গ রায় এবং রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতির প্রান্ত বৌদিক প্রচার প্রমুখ মুক্তা চক্রবর্তীও মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। সম্মেলনের সঞ্চালনা করেন বিপ্লব বিশ্বাস।
সভাপতি প্রবাল দেব স্বাগত বক্তব্যে বলেন, “সনাতন ধর্মের গভীর দর্শনে বিশ্বের সৃষ্টি এক চিরন্তন চক্রের অংশ। এই সৃষ্টি পৃথিবীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, এবং এর কোনো চূড়ান্ত বিনাশ নেই—শুধু রূপান্তর ঘটে। বেদ-উপনিষদের মতে, ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, বিষ্ণু পালন করেন, শিব সমাহার করেন, কিন্তু সবকিছু আবার উদ্ভূত হয়। পৃথিবী পঞ্চভূতের মধ্যে ভূতত্ত্বের প্রতীক, যা মহাপ্রলয়েও বীজরূপে অস্তিত্ব ধরে রাখে।”রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতির প্রান্ত বৌদিক প্রচার প্রমুখ মুক্তা চক্রবর্তী বলেন, “সনাতন ধর্মের অমর বাণী—‘একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি’। একই সত্যকে বিভিন্ন নামে-রীতিতে ডাকি, কিন্তু মূল—একত্ব, কর্মযোগ ও ধর্মরক্ষা। আজ সম্প্রদায় চ্যালেঞ্জের মুখে সাংস্কৃতিক আলোড়ন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক অবহেলা, সমাজবিভাজন—সনাতনীদের ঐক্য ছাড়া অগ্রসর হওয়া অসম্ভব।” তিনি সকলকে ঐক্যের আহ্বান জানান।

আরএসএস-এর দক্ষিণ আসাম প্রান্তের প্রান্ত প্রচারক গৌরাঙ্গ রায় বলেন, “সাধু-সন্তরা যেমন স্বামী বিবেকানন্দ বা সনাতন ধর্মের আচার্যরা হিন্দুকে শুদ্ধতা, ত্যাগ ও সেবার পথ দেখান। আরএসএস এই নির্দেশনা অনুসরণ করে সদ্ভাব, অহিংসা ও জাতীয়তাবাদ প্রচার করে। এটি ভোটব্যাঙ্কের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে হিন্দুকে আত্মনির্ভর করে। ফলে সম্প্রদায় রাজনৈতিক বিভ্রান্তিতে না পড়ে ধর্মীয় জীবন যাপন করতে পারে।”ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংগঠক স্বামী সাধনানন্দজি মহারাজ বলেন, “হিন্দুত্ব শুধু একটি ধর্মীয় পরিচয় নয়, এটি একটি জীবনদর্শন, যা মানবত্বের সার্বজনীন মূল্যবোধ, হিন্দুদের পূর্বপুরুষকেন্দ্রিক ভারতবর্ষ এবং একটি সম্পূর্ণ জীবনশৈলীর সমন্বয়। এই ধারণাটি স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র এবং ভিনায়ক দামোদর সাভারকরের মতো মহান চিন্তাবিদদের দ্বারা সমৃদ্ধ। হিন্দুত্বের মধ্যে মানবত্বের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এটি সকল মানুষের প্রতি করুণা, সহানুভূতি এবং সমতার বার্তা দেয়, যা বেদান্তের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’ (সমস্ত বিশ্বই আমার পরিবার) ধারণায় প্রতিফলিত।” সম্মেলনে আর্য সংস্কৃতি বোধনি সমিতির মহিলা শিল্পীরা উদ্বোধনী সঙ্গীত এবং ধামাইল নৃত্য পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
অন্যান্য মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন পুর কমিশনার মধূমিতা শর্মা, অরূপকান্তি দাস, সূপর্ণা তেওয়ারি। স্বামী সাধনানন্দজি মহারাজ উপস্থিত সবাইকে হিন্দু জাগরণ ও আত্ম জাগরণের শপথবাক্য পাঠ করান। শেষে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজের পূজা ও আরতী করেন দুই স্বামীজি স্বামী সাধনানন্দ মহারাজ ও স্বামী গুনসিন্ধুজি মহারাজের জন্য।স্থানীয়রা মত প্রকাশ করেছেন, এই সম্মেলন সনাতন ধর্মের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে আরও দৃঢ় করার প্রতীক হয়ে উঠেছে।



