কাছাড়ে বিরল জাম্পিং মাকড়সার সন্ধান, ভারতে প্রথম

বরাক তরঙ্গ, ৩১ জানুয়ারি : বরাক উপত্যকার জীববৈচিত্র্য গবেষণায় নতুন সংযোজন। কাছাড় জেলার সংরক্ষিত অরণ্যাঞ্চল থেকে বিরল প্রজাতির একটি জাম্পিং মাকড়সার সন্ধান পেয়েছেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। গবেষকদের দাবি, ভারতে এই প্রজাতির মাকড়সার এটি প্রথম নথিভুক্ত উপস্থিতি। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু বরাক উপত্যকার অজানা জীববৈচিত্র্যকেই সামনে আনেনি, বরং ইন্দো-বর্মা জীববৈচিত্র্য হটস্পট অঞ্চলে এখনও কতটা গবেষণার সুযোগ রয়ে গেছে, তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

যে প্রজাতিটির সন্ধান মিলেছে, তার বৈজ্ঞানিক নাম কলাইটাস বিলিনিয়েটাস বা দুই-ডোরা জাম্পিং মাকড়সা। কাছাড় জেলার লোহারবন্দ এলাকার ইনার লাইন সংরক্ষিত অরণ্য থেকে প্রজাতিটি নথিভুক্ত করেছেন গবেষক মণিকা ছেত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর গবেষণা-পরিচালক অধ্যাপক পার্থঙ্কর চৌধুরী, যিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। গবেষণায় সহযোগিতা করেন চেন্নাইয়ের সেভীথা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরাকনোলজি বিশেষজ্ঞ জন টিডি ক্যালেব।

মণিকা ছেত্রী জানান, এই গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমীক্ষিত গবেষণা পত্রিকা জার্নাল অব থ্রেটেন্ড ট্যাক্সা-তে প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, এতদিন পর্যন্ত কলাইটাস বিলিনিয়েটাস প্রজাতির উপস্থিতি শুধুমাত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে নথিভুক্ত ছিল। অসমে এই প্রজাতির সন্ধান পাওয়া তার পরিচিত ভৌগোলিক বিস্তারের এক বড়সড় সম্প্রসারণ এবং ভারতে এই প্রজাতির প্রথম রেকর্ড। তিনি জানান, জাম্পিং মাকড়সাটি সল্টিসিডি গোত্রভুক্ত এবং কলাইটাস প্রজাতির অন্তর্গত। বিশ্বজুড়ে এই গণের প্রজাতি সংখ্যা খুবই কম। ভারতে এতদিন এই গণের মাত্র দুটি প্রজাতি কলাইটাস নংওয়ার এবং কলাইটাস প্রোশিনস্কি-ই পরিচিত ছিল। নতুন এই প্রজাতির সংযোজনে ভারতের জাম্পিং মাকড়সার পরিচিত বৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ হল।

মণিকা ছেত্রী জানান, গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ কাছাড় জেলায় অরণ্য ও কৃষিভিত্তিক বাস্তুতন্ত্রে মাকড়সার বৈচিত্র্য নিয়ে মাঠ পর্যায়ের গবেষণার সময় এই নমুনাটি সংগ্রহ করা হয়। গাছপালার ঝাকুনি পদ্ধতিতে মাকড়সাটি সংগ্রহ করে ইথানলে সংরক্ষণ করা হয়। পরে পরীক্ষাগারে বিশদ আকৃতিগত বিশ্লেষণ ও আলোকচিত্রের মাধ্যমে প্রজাতিটি নিশ্চিত করা হয়। সংগৃহীত নমুনাটি বর্তমানে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ গবেষণাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। মণিকা ছেত্রীর মতে, জাম্পিং মাকড়সারা মূলত মাকড়সাওলি পোকামাকড় খেয়ে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে কৃষিকাজ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের পক্ষে এরা উপকারী,’ বলেন তিনি। তাঁর সংযোজন, শিকার ধরার জন্য লাফ দেওয়ার যে ক্ষমতা এই গোত্রের মাকড়সার বৈশিষ্ট্য, তা দীর্ঘ প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল।

এই প্রজাতি কীভাবে অসমে এল, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি। মানব ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে বিস্তার ঘটতে পারে, অথবা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আগে থেকেই উপস্থিত থাকলেও এতদিন নজরে না আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না গবেষকরা। অধ্যাপক চৌধুরীর বক্তব্য, আকারে ছোট হলেও জাম্পিং মাকড়সারা অরণ্য বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যখন সংরক্ষণ ভাবনায় বড় স্তন্যপায়ী পাখিরাই বা বেশি গুরুত্ব পায়, তখন এই গবেষণা মনে করিয়ে দেয় যে, অসমের জীববৈচিত্র্য তার ক্ষুদ্রতম বাসিন্দাদের মাধ্যমেও সমানভাবে গঠিত। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার উত্তর-পূর্ব ভারতের জীববৈচিত্র্য নথিভুক্তকরণে দুর্বল দিকেও ইঙ্গিত করছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৩ হাজার পরিচিত প্রজাতির মাকড়সা হলেও ভারতে এই বিষয়ে গবেষণা এখনও সীমিত। ছোট প্রজাতিগুলি প্রায়ই অবহেলিত থেকে যায়। অথচ বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া ও ভারসাম্যপূর্ণ গবেষণার জন্য এদের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি তাঁরা জীববৈচিত্র্য গবেষণার জন্য উন্নত পরিকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার দাবিও জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *