বরাক তরঙ্গ, ৭ মার্চ : ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিদেশি ঘোষিত হয়ে একসময় ডিটেনশন ক্যাম্পে কাটাতে হয়েছিল জীবনযুদ্ধের কঠিন সময়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (কা)-এর অধীনে ভারতের নাগরিকত্ব পেলেন কাছাড় জেলার ধলাই থানার হাওয়াইথাং এলাকার বাসিন্দা দীপালি দাস (৬০)। ট্রাইব্যুনালে বিদেশি হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর ‘কা’ আইনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার ঘটনা কাছাড় তথা অসমে এই প্রথম বলে জানা গেছে।
দেশভাগের প্রভাব বহু মানুষের জীবনে যেমন গভীর ছাপ ফেলেছিল, তেমনি তার ব্যতিক্রম নন দীপালি দাসও। বাংলাদেশের সিলেট জেলার ধীরাই থানার দিপুপুর গ্রামে ১৯৬৬ সালের ৩ ডিসেম্বর তাঁর জন্ম। সেখানেই বেড়ে ওঠা এবং পরবর্তীতে অভিমন্যু দাসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে ১৯৮৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জন্মভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হন তিনি। এরপর কাছাড় জেলার ধলাই থানার হাওয়াইথাং এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
কিন্তু ভারতে আশ্রয় নেওয়ার কয়েক বছর পরই তাঁর জীবনে নেমে আসে নতুন বিপর্যয়। তাঁর বিরুদ্ধে জারি হয় বিদেশি নোটিশ। ২০১৩ সালে শুরু হওয়া এই আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাছাড়ের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বিদেশি ঘোষণা করে। এর পরের বছর ১০ মে পুলিশ তাঁকে আটক করে শিলচর সেন্ট্রাল জেলের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠায়। প্রায় দুই বছর সেখানে বন্দি থাকার পর ২০২১ সালের ১৭ মে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
দীপালির মুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শিলচরের সমাজকর্মী কমল চক্রবর্তী। জামিনে মুক্তির পরও তিনি দীপালির পাশে ছিলেন। এসময় কার্যকর হয় সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (কা), যা দীপালির জীবনে নতুন আশার আলো নিয়ে আসে। বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় শিলচরের আইনজীবী ধর্মানন্দ দেবের সঙ্গে কমল চক্রবর্তী তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দেন।

ধর্মানন্দ দেব ও আইনজীবী দেবস্মিতা সোমের সহায়তায় ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দীপালি ‘কা’ আইনের অধীনে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন। প্রায় এক বছর এক মাসের অপেক্ষার পর শুক্রবার তিনি ভারতের নাগরিকত্ব লাভ করেন।
আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব জানান, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে মামলার সময় পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত দীপালির নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় সহায়ক হয়ে দাঁড়ায়। ওই রিপোর্টে উল্লেখ ছিল যে দীপালি বাংলাদেশের সিলেট জেলার বানিয়াচং এলাকার বাসিন্দা এবং তিনি ১৯৭১ সালের পর ভারতে প্রবেশ করেন। সেই ভিত্তিতেই ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বিদেশি ঘোষণা করেছিল।
তবে ‘কা’ আইনের অধীনে নাগরিকত্ব পেতে আবেদনকারীর প্রমাণ করতে হয় যে তিনি বাংলাদেশ বা নির্দিষ্ট অন্যান্য দেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে নথির অভাবে এই প্রমাণ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু দীপালির ক্ষেত্রে পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের ‘সার্টিফায়েড কপি’ই প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়। ফলে নতুন করে অতিরিক্ত প্রমাণের প্রয়োজন হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত নাগরিকত্ব লাভের পথ প্রশস্ত হয়।



