ধুলো ও ধোঁয়ার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে কাছাড়ের হাওয়াইথাং-লায়লাপুর, উদ্বেগ

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ১১ মার্চ : কাছাড় জেলার অসম-মিজোরাম সীমান্তবর্তী হাওয়াইথাং-লায়লাপুর অঞ্চলে দিনদুপুরেই আকাশ যেন ধোঁয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। দৃশ্যটি দেখলে অনেকের মনে হতে পারে এটি যেন দেশের কোনো বড় দূষিত নগরীর ছবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি বরাক উপত্যকার এক প্রত্যন্ত পাহাড়ঘেরা এলাকার বর্তমান চিত্র, যা রেংটি পাহাড় ও লুসাই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত।

এই এলাকা থেকে নিকটতম শহর শিলচরের দূরত্ব প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার। অথচ পাহাড়ঘেরা এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর অঞ্চলেও এখন আর নির্মল নীল আকাশ দেখা যায় না। দিনের আলোতেও চারদিকে ধুলোর ঘন স্তর ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেসে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে, যা এলাকার পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

স্থানীয়দের মতে, এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের ভারতমালা প্রকল্পের আওতায় চলা শিলচর–আইজল জাতীয় সড়ক প্রশস্তকরণ কাজ। বর্তমানে এই সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে ব্যাপক নির্মাণকাজ চলছে। রাস্তা প্রশস্ত করতে মাটি ভরাট, নালা, সেতু, কালভার্ট ও উড়ালপুল নির্মাণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ ধুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।  কয়েক মাস ধরে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বৃষ্টি না থাকায় বাতাসে ভাসমান ধুলো জমাট বেঁধে আকাশ-বাতাসকে ধূসর করে তুলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্মাণ সংস্থা মাঝে মাঝে অল্প পরিমাণ জল ছিটিয়ে দায়সারা ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

অন্যদিকে, এই সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করেছে এলাকায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ইটভাটা। স্থানীয়দের ভাষায়, “ব্যাঙের ছাতার মতো” গজিয়ে ওঠা একাধিক ইটভাটা থেকে দিনরাত কয়লা পোড়ানো ধোঁয়া বের হচ্ছে। সেই ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস ও সূক্ষ্ম ধুলিকণা বাতাসে মিশে পরিবেশকে আরও বিষাক্ত করে তুলছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের কাঁচা পথ, ফাঁকা মাঠ ও অলিগলি দিয়ে অবিরাম চলাচল করছে বৈধ ও অবৈধ মাটিবাহী ভারী যানবাহন। এসব যানবাহন চলাচলের ফলে প্রায়ই ধুলোর ঝড় উঠছে, যা পুরো এলাকার বাতাসকে প্রায় স্থায়ীভাবে ধোঁয়াটে করে তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই দূষণের ফলে ইতিমধ্যেই বহু মানুষ সর্দি, কাশি, চোখ জ্বালা ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসজনিত অসুস্থতার লক্ষণ বাড়তে শুরু করেছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকার মানুষ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন এ ধরনের দূষিত পরিবেশে বসবাস করলে ফুসফুসের রোগ, হাঁপানি, অ্যালার্জি এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে ধুলো ও কয়লা পোড়ার ধোঁয়ার মিশ্রণ কৃষিজমি, গাছপালা এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই গুরুতর পরিবেশগত সংকট সত্ত্বেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিভিন্ন সংগঠন কিংবা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তেমন কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয়দের দাবি রাস্তা নির্মাণকাজে নিয়মিত পর্যাপ্ত জল ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, ইটভাটাগুলোর উপর কঠোর পরিবেশগত বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে এবং অবৈধ মাটিবাহী যানবাহনের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে কাছাড়ের এই সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল ভবিষ্যতে মারাত্মক দূষণ সংকটে পড়তে পারে। প্রকৃতি ও মানুষের স্বাস্থ্যের স্বার্থে প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সচেতন সমাজের এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *