বরাক তরঙ্গ, ২৮ ফেব্রুয়ারি : বিজ্ঞান যে কত বিশাল, কোন মাত্রায় তার ব্যাপ্তি, শনিবার বঙ্গভবনে আয়োজিত জাতীয় বিজ্ঞান দিবসের অনুষ্ঠানে সে কথাই তুলে ধরেছেন বক্তাগণ। মহারাজ বীর বিক্রম কলেজের (অধুনা বিশ্ববিদ্যালয়) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিশিষ্ট লেখক পূর্ণেন্দুকান্তি দাশ ‘আসুন, ব্রহ্মাণ্ডকে জানি’ শীর্ষক বক্তৃতায় বলেন, “আমরা বিরাট বোঝাতে সারা পৃথিবীর কথা উল্লেখ করি। প্রবল প্রতাপশালী বলতে সূর্যকেই বোঝাই, যার আলোয় গোটা পৃথিবী আলোকিত হয়। কিন্তু পৃথিবী একটি গ্রহমাত্র, সূর্য হচ্ছে একটি নক্ষত্র। এই ধরনের কত কত গ্রহ-নক্ষত্র মিলে তৈরি হয় একটি গ্যালাক্সি। আমরা পৃথিবীর মানুষ এক গ্যালাক্সিতে রয়েছি। আমাদের এই গ্যালাক্সির বাইরে রয়েছে এই ধরনের হাজার হাজার গ্যালাক্সি।”
বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের কাছাড় জেলা সমিতি এ দিন কাছাড় কলেজ বিজ্ঞান ফোরাম এবং আসাম বিজ্ঞান সমিতির শিলচর শাখার সহযোগিতায় এই বক্তৃতানুষ্ঠানের আয়োজন করে। পূর্ণেন্দুকান্তি দাশ ছিলেন নির্ধারিত বক্তা। তিনি উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের কাছে ব্রহ্মাণ্ডের রহস্যকে নানাদিক থেকে বিবৃত করেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বরিষ্ঠতম অধ্যাপক অশোককুমার সেন অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বলেন, বিজ্ঞানের পরিধি অসীম বিস্তৃত। এ নিয়ে কাজ করা বিরাট এক সাধনার বিষয়। তাই প্রকৃতই যাঁরা বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের মনে কখনও অহঙ্কার আসতে পারে না। কারণ তাঁরা বুঝতে পারেন, এই অসীমের মধ্যে একজন মানুষ কতটা আর কী করতে পারছেন! তাঁর কথায়, বিজ্ঞান ডান-বাম বোঝে না, ধর্ম-অধর্ম বোঝে না। বিজ্ঞান বোঝে শুধু বাস্তবতাকে।
আসাম বিজ্ঞান সমিতির শিলচর শাখার সভাপতি তথা আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক ড. পার্থঙ্কর চৌধুরী বলেন, বিজ্ঞান কোনও শাখায় সীমিত নয়। ফিজিক্সের ছাত্র বোটানির কিছুই বুঝবে না, বায়োলজির ছাত্র কেমিস্ট্রির কিছুই বুঝবে না, এ হতে পারে না। বিজ্ঞানকে জানতে হলে প্রতিটি শাখার প্রাথমিক বিষয়গুলি জানতে হবে। কারণ এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।
সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে বিজ্ঞান দিবস পালনের কথা শুনে তিনি বিস্ময় বোধ করছিলেন কাছাড় কলেজ সায়েন্স ফোরামের সভাপতি মুকুলকুমার বরুয়া। একথা জানিয়ে তিনি বলেন, “বিভিন্ন বক্তার মুখে এর প্রাসঙ্গিকতা শুনে এই প্রয়াসের সার্থকতা উপলব্ধি করছি।”

এই অঞ্চলের বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞান সাহিত্য রচনার কথা উল্লেখ করেন বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের কাছাড় জেলা সমিতির সভাপতি সঞ্জীব দেব লস্কর ও সম্পাদক উত্তমকুমার সাহা। প্রারম্ভিক বক্তব্যে সম্পাদক সাহা বলেন, বিজ্ঞানের কথা সবার সামনে তুলে ধরা বা এর বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে চাই বিজ্ঞান সাহিত্য। এ প্রসঙ্গে তিনি পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করেন বিপিনচন্দ্র দাস, রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের কথা। করিমগঞ্জ জেলার (অধুনা শ্রীভূমি) বিপিনচন্দ্র দাস বাংলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন। রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য বাংলা হরফে টেলিগ্রাম প্রেরণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এছাড়া, শিলচরের সন্তান বিমান নাথ রমন ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা করে সদ্য অবসর নিয়েছেন।
সঞ্জীব দেব লস্কর যোগ করেন বিজ্ঞানী কান্তিভূষণ সেনের কথা। তাঁর দাবি, “গর্ববোধ করতে হয় এই অঞ্চলের জন্য, এই অঞ্চলের বিজ্ঞানসাধকদের জন্য। আরও অনেকের কথা আমরা জানি না আমাদের ঔদাসীন্যের জন্য।”
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বরাক বঙ্গের জেলা সমিতির সহ-সভাপতি ড. জয়ন্ত দেবরায়। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কোষাধ্যক্ষ বকুলচন্দ্র নাথ।
এই অনুষ্ঠানে কাছাড় কলেজের আইকিউএসি এবং একসেলেন্ট পাবলিশার্স প্রকাশিত একটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন হয়। মুকুলকুমার বরুয়া, রাহুল কান্তি নাথ ও জয়ব্রত নাথ সম্পাদিত ‘ট্রান্স ডিসিপ্লিনারি সায়েন্স: ম্যাপিং দ্য ফিউচার রিসার্চ’ গ্রন্থটির মোড়ক খুলে আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন পূর্ণেন্দুকান্তি দাশ। পূর্ণেন্দু কান্তি এ দিন তাঁর লেখা আটটি গ্রন্থ বঙ্গভবন গ্রন্থাগারে রাখার জন্য উপহার হিসেবে তুলে দেন সভাপতি সঞ্জীব দেবলস্করের হাতে।



