ভুবন পাহাড়ের পাদদেশে ‘বাঘ’ নয়, মৃত অবস্থায় উদ্ধার বিরল বন্যপ্রাণী লেপার্ড ক্যাট

বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, মরণোত্তর পরীক্ষা ছাড়াই মাটিচাপা দেওয়ায় ক্ষোভ

রাজীব মজুমদার, ধলাই।
বরাক তরঙ্গ, ১ জানুয়ারি : ভুবন পাহাড়ের পাদদেশে মৃত অবস্থায় একটি বাঘ-সদৃশ প্রাণীর ছবি সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হতেই সৃষ্টি হয় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও কৌতূহলের। ছবিতে প্রাণীটির গায়ের ছোপছোপ দাগ ও আকার দেখে অনেকেই ধারণা করেন, ভুবন পাহাড়ে হয়তো বাঘ বা চিতাবাঘের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠে—তাহলে কি সত্যিই ভুবন পাহাড়ে বড় মাংসাশী বন্যপ্রাণীর বিচরণ শুরু হয়েছে? প্রাণীটির মৃত্যুই বা কীভাবে হলো? সমাজ মাধ্যমের গণ্ডি ছাড়িয়ে খবরটি দ্রুতই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলে  হুলস্থুল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিষয়টির প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানে বৃহস্পতিবার একদল সাংবাদিক ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেই সময় ঘটনাস্থলে স্থানীয় বহু মানুষও জড়ো হন। জানা যায়, ভাইরাল হওয়া বাঘ-সদৃশ প্রাণীটিকে ইতিমধ্যেই স্থানীয়ভাবে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত জানতে সাংবাদিকরা বন বিভাগের মনিয়ারখাল ফরেস্ট রেঞ্জের অধীন মনিয়ারখাল বিট কার্যালয়ের বিট অফিসার আশরাফ হোসেন মজুমদার-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিস্ময়করভাবে, বিট কার্যালয় থেকে অল্প দূরত্বে এমন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও বিট অফিসার প্রথমে বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানান। অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিক ও স্থানীয়দের অনুরোধের পর প্রায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় অতিবাহিত হলে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছান। বিট অফিসারের উপস্থিতিতে পুনরায় মাটি খুঁড়ে প্রাণীটির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর ঘটনাস্থল থেকে তোলা ছবি বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলে প্রাণীটির প্রজাতি সনাক্ত হয়। বন বিভাগের মতে, মৃত প্রাণীটি কোনো বাঘ বা চিতাবাঘ নয়। এটি একটি লেপার্ড ক্যাট  বা চিতি-বিড়াল
প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে লেপার্ড ক্যাট দেখতে অনেকটা ছোট চিতাবাঘের মতো হওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রায়ই একে বাঘ বা চিতাবাঘ ভেবে ভুল করেন। লেপার্ড ক্যাট মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি পরিচিত বন্যপ্রাণী। ভারতবর্ষে এটি পাওয়া যায়
উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রায় সব রাজ্যে (অসম, মিজোরাম, ত্রিপুরা, মণিপুর, নাগাল্যান্ড) পাহাড়ি ও বনাঞ্চলে দেখা মেলে এজাতীয় প্রাণীর।

এরা সাধারণত ঘন জঙ্গল, বাঁশঝাড়, পাহাড়ি এলাকা ও ঝোপঝাড়পূর্ণ অঞ্চলে বসবাস করে। নিশাচর স্বভাবের এই প্রাণী ছোট স্তন্যপায়ী, পাখি ও ইঁদুর জাতীয় প্রাণী শিকার করে বেঁচে থাকে।
প্রজাতি সনাক্ত হওয়ার পরও কোনো ধরনের মরণোত্তর পরীক্ষা  ছাড়াই প্রাণীটিকে পুনরায় মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল। তাঁদের মতে, “প্রাণীটির মৃত্যু স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক—তা যাচাই করা বন বিভাগের দায়িত্ব ছিল। বিষক্রিয়া, ফাঁদ, চোরাশিকার কিংবা পরিবেশগত কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন ছিল।”

স্থানীয় একাংশের অভিযোগ, ঐতিহ্যবাহী ভুবন পাহাড়ের বনভূমি বহু আগেই কার্যত উজাড় হয়ে গেছে। আগাছা ও ঝোপঝাড় ছাড়া বড় গাছগাছালি প্রায় নেই বললেই চলে। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে বসবাসকারী বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে বন বিভাগ সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

এর আগেও একাধিকবার ভুবন পাহাড় এলাকা থেকে বনজ সম্পদ কাটা ও পাচারের অভিযোগ সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে। এবার একটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণীর মৃত্যুতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এলো ধলাই বিধানসভা এলাকার মনিয়ারখাল বিট কার্যালয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, লেপার্ড ক্যাট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ অনুযায়ী সুরক্ষিত প্রাণীর তালিকাভুক্ত। যদিও এটি আইইউসিএন অনুযায়ী শ্রেণিভুক্ত, তবুও বন ধ্বংস, মানব হস্তক্ষেপ ও অবৈধ শিকারের কারণে অনেক এলাকায় এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

ভুবন পাহাড়ের পাদদেশে লেপার্ড ক্যাটের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণীর মৃত্যু নয়, বরং বন বিভাগের দায়িত্বহীনতা, বন উজাড় ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অবহেলার একটি বড় উদাহরণ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। প্রকৃত তদন্ত ছাড়া প্রাণীটিকে মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *