কথা থাকলেও রূপ থাকছে না রূপকথায় : শান্তনু সরকার

Spread the news

একুশে পালনে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের আলোচনা______

বরাক তরঙ্গ, ২০ ফেব্রুয়ারি : একুশের প্রাক্ সন্ধ্যায়ই একাদশ শহিদের শহর শিলচরে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের সূচনা করল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ। শুক্রবার মধ্যসহর সাংস্কৃতিক সংস্থার সভাগৃহে গানে-কথায় এই সন্ধ্যা ছিল এদিন আক্ষরিক অর্থেই আবেগ ও আন্তরিকতার ছোঁয়ায় এবং সংক্ষিপ্ত পরিসরে ঋদ্ধ। শুরুতে অনুষ্ঠানের রেশ ধরিয়ে দেন মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক অজয়কুমার রায়। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় গৌড়ীয় নৃত্য কলাভারতীর শিল্পী অক্ষরা দাসের এক সুন্দর ও শিল্প সুষমামণ্ডিত নৃত্যের মাধ্যমে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিবেশন করে শিলচর ইয়ুথ কয়্যার। প্রথমেই শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। এরপর হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘লঙ্গর ছাড়িয়া দে’ গানে দর্শকদের আন্দোলিত করেন। এভাবেই একে একে সঙ্গীতে শান্তিকুমার ভট্টাচার্য, দেবাশিস চৌধুরী, ইন্দ্রাণী দত্ত,কমলিকা নাথ,ঝিমি রায়, সুপর্ণা দাস ভট্টাচার্য অনুষ্ঠানকে নিজ নিজ পরিবেশনে সাজিয়া তোলেন। শিল্পীদের তবলায় সঙ্গত করেন সন্তোষ চন্দ, কিবোর্ডে ঋষিকেশ চক্রবর্তী। সমবেত নৃত্য বংশিতা কলা নিকেতনের ছাত্রছাত্রীও একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের প্রাক সন্ধ্যাকে ভিন্ন রূপ দেন।

এদিন এই অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যেশ্য ব্যাখ্যা করেন মঞ্চের সভাপতি মনোজ দেব। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বলতে গিয়ে মনোজবাবু জানান, ধর্মের একটা জায়গাকে সরিয়ে রেখে এমন আন্দোলন হয়নি। তদানিন্তন পূর্ব-পাকিস্তানে সেই আন্দোলন পৃথিবীর এক অনন্য সংগ্রাম। তিনি কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ‘যে কেড়েছে বাস্তুভিটা সেই কেড়েছে ভয়/আকাশজুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়’ পংক্তি দিয়ে বাংলা তথা মাতৃভাষার বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গ তুলে আনেন। বলেন,ভাষার জন্য লড়াইর উদাহরণ ও প্রেরণা হল বাহান্নর আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই উপত্যকা একুশের অনুসারি।

এদিন সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনের পরেও বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপটে শিশুসাহিত্য এবং এ বিষয়ক নির্ধারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বিষয় ছিল ‘গল্প শুনে বেড়ে ওঠা : ঠাকুরমার ঝুলি থেকে হ্যারি পটার’। আমন্ত্রিত বক্তা শিক্ষিকা ও চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক পাপড়ি ভট্টাচার্য তাঁর বক্তব্যে বলেন, আলোচনার বিষয়টি বড় ছাতার মতো। এর তলায় অনেক। সামনে বসিয়ে,গায়ে হাত বুলিয়ে গল্প শোনানোর সে সময় এখন নানা কারণেই নেই। সে সময় শুনতো সবাই। বিবর্তনের সঙ্গে গল্প শোনা, দেখা সবই থাকবে। কিন্তু এখন শিশুদের মন ও শরীরের ওপর কি প্রভাব পড়ছে, এটা ভাবার। পাপড়ি বলেন, মাতৃভাষায় গল্প শুনলে আরও বেশি একাত্ম হতে পারে শিশুরা। গল্পগুলো শুনে আগামীর লড়াই বা জীবনকে চিনতে সুবিধা হবে। তিনি ‘কিচ্ছা’-র প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন। বলেন, বিদ্যালয় ও বাস্তবজীবনের জন্য পড়ার মধ্যে তফাৎ আছে। আজকাল সব ঠিক হচ্ছে ভাইরাল, ট্র্যান্ডিং, ভিউয়ার, টাকা এবং বাজার ইত্যাদির নিরিখে। ফলে মধ্যমেধা ও নিম্নমেধার সৃষ্টিগুলো হু হু করে চলে। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ থেকে ‘হ্যারি পটার’-এর পর আদৌ কিছু হচ্ছে বলে মনে হয় না। পৃথিবীটা একক কোনও চরিত্রের গল্প নিয়ে নয়। শিশুদের মনে রং ভীষণ কাজ করে। এই রং নিয়ে দেখা যাচ্ছে বিষন্নতা তৈরি হচ্ছে। শৈশব পাল্টে যাচ্ছে। আসলে এসব পরিকল্পিত বলেই মনে হয়। কেবলই মনে হয়, শিশুগুলোকে যন্ত্র বানানো হচ্ছে, জানান তিনি। তাঁর কথায়, এর থেকে উত্তরণের পথ হল নিজেদের মধ্যে সাবধানতা অবলম্বন। অন্যথায় স্ক্রলিঙে হারিয়ে যাবে শৈশব ও ভবিষ্যৎ।
বিষয়ের ওপর মুখ্য বক্তা ছিলেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শান্তনু সরকার। তিনি বলেন, শোনা ও পড়া এক নয়, দেখা ও শোনাও এক নয়। তাছাড়া শিশুদের জন্য আলাদা কিছু ছিল না, এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন শান্তনু। বলেন, এটা নতুন বিষয়। বড়জোর আড়াইশো বছরের ইতিহাস। এখনকার রূপকথায় কথা থাকলেও রূপ থাকছে না। তিনি জানান, বাঙালি জাতীয়তাবাদের হাত ধরেই তখনকার শিশুসাহিত্য হত। আজকের যুগে হিংসা নিয়ে যা-ই বলা হোক না কেন, পূতনা বধ ও আরও কিছু কাহিনীর উদাহরণ টেনে বলেন, ভায়োলেন্স ছিল পুরাণেও। তাঁর মতে, শিশু পুরনো হয়না। শিশু শিশুই থাকে। সময় ও আঙ্গিক পাল্টায় কালের যাত্রায়। তাঁর বক্তব্য হল, কৃত্রিমভাবে সামাজিকতা নয়।

অনুষ্ঠানে দুই বক্তাকে উত্তরীয় পরিয়ে ও স্মারক দিয়ে সম্মাননা জ্ঞাপন করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মনোজ দেব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *