বরাক তরঙ্গ, ১৯ ফেব্রুয়ারি : পঞ্চদশ অসম বিধানসভার চারদিনব্যাপী লেখানুদান বাজেট অধিবেশনের বৃহস্পতিবার শেষ দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে সদনের কার্যক্রম শুরু হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরের বার্ষিক প্রশাসনিক প্রতিবেদনও সভায় উপস্থাপন করা হয়। অধিবেশনের শেষ দিনে অসম সরকারের ধন্যবাদসূচক ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন।
পাঁচ বছরের কার্যকালের শেষ ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী অসম সরকারের গত কয়েক বছরের কাজের খতিয়ান তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন। দীর্ঘ ভাষণে তিনি নিজের জীবনের প্রথম নির্বাচনে পরাজয়ের অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করেন।
যুব বিধায়কদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যারা আমাদের ভোট দেয়নি, তারা আমাদের শত্রু নয়। যারা ভোট দেয়নি, তাদেরও সমানভাবে সেবা করতে হবে। ১৯৯৬ সালে আমি যখন প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি, তখন ১৭ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছিলাম। রাজনীতিতে কখনও হার, কখনও জয় থাকবে। কিন্তু মানুষের প্রতি আমাদের সেবা অব্যাহত রাখতে হবে।”
তিনি সকল বিধায়ককে আসন্ন নির্বাচনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “গতকাল আমি পুরনো দিনের কথা ভাবছিলাম। জীবনের প্রথম নির্বাচনে পরাজয়ের পর কীভাবে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছি। যে কেন্দ্রে প্রথমবার ১৭ হাজার ভোটে হেরেছিলাম, সেই কেন্দ্রেই ২০০১ সালে ১০ হাজার ভোটে জয়ী হই। ২০০৬ সালে ৪২,৪৬৮ ভোটে, ২০১১ সালে ৭৭,৪০৩ ভোটে, ২০১৬ সালে ৮৬,৯৩৫ ভোটে এবং ২০২১ সালে এক লাখ এক ভোটে জয়ী হই। একই কেন্দ্র, একই মানুষ।”
তিনি আরও বলেন, “যারা ভোট দেয়নি, তারা আমাদের শত্রু নয়। আমাদের সকলের জন্য কাজ করতে হবে। ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমি এই কথা বলছি। যুব বিধায়কদের উচিত চিন্তা করা, যারা আমাদের ভোট দেয়নি তাদের কীভাবে আকৃষ্ট করা যায় এবং কীভাবে তাদের সেবা করা যায়। তখন মানুষ কখনও কোনও নেতাকে অপছন্দ করবে না।”
অসমের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “১৬তম অর্থ কমিশন আমাদের ডিভোলিউশন ৩.২৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। এর ফলে আগামী বছরে অসম কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ডিভোলিউশন গ্রান্ট হিসেবে ৫০ হাজার কোটি টাকা পাবে। রাজ্যের নিজস্ব রাজস্বও আগামী বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে অসমের অর্থনীতি ১০ লাখ কোটি টাকার হওয়ার লক্ষ্য থাকলেও আমরা আগামী বছরই ৮.৭১ লাখ কোটি টাকার অর্থনীতিতে পৌঁছাব। ২০২৭-২৮ সালের মধ্যেই অসমের অর্থনীতি ১০ লাখ কোটি টাকার হবে, যা নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই। গত পাঁচ বছরে অসমের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৪৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অসম দেশের দ্রুত উন্নয়নশীল রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম। আগামী পাঁচ বছরে মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে অসম পশ্চিমবঙ্গকেও ছাড়িয়ে যাবে।”
শক্তি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আগামী দশ দিনের মধ্যে কপিলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প উদ্বোধন করা হবে, যার মাধ্যমে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রায় দুই-আড়াই হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন সৌরশক্তি প্রকল্প এবং কার্বি আংলংয়ে ২৫ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। ২০৩২ সালের মধ্যে সৌরশক্তিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনে অসম স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজ্যে পরিণত হবে।”
প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “গত পাঁচ বছরে আমাদের সরকার ১ লাখ ৫৯ হাজার সরকারি চাকরি দিয়েছে। নির্বাচনের আগে শিক্ষা বিভাগ ভালোভাবে কাজ করতে পারলে আরও ৫ হাজার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এটি একটি রেকর্ড। নিয়োগ নিয়ে আদালতে একটিও মামলা নেই। আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে প্রথম তিন বছরে শুধু শিক্ষা বিভাগেই ৫৫ হাজার চাকরি দেওয়া হবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রকল্প সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই প্রকল্পের মাধ্যমে বহিরাজ্যে মৃত্যুবরণ করা ১৬২ জন অসমবাসীর মৃতদেহ রাজ্যে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অক্টোবর মাসে এই প্রকল্প শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে, কেন অসমের ছেলে-মেয়েরা বাইরে যায়, কোথায় কাজ করে। তারা অসমের বাইরে বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত। আগামী ২০ বছরে যদি অসমে ২০ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ আনা যায়, তাহলে বহিরাজ্যে কর্মরত অসমের যুবক-যুবতীরা রাজ্যে ফিরে আসবে। আমাদের সরকার সংবেদনশীলতার সঙ্গে কাজ করে আসছে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি জাপানের ২০টি কোম্পানি জাগিরোডে আসবে এবং শিল্পপার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে সমীক্ষা করবে। মুখ্যমন্ত্রীর আত্মনির্ভর অসম প্রকল্পে গতবার ২৫ হাজার যুবক-যুবতীকে এক লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে মাত্র তিন হাজার ক্ষেত্রে অপব্যবহার হয়েছে।
আগামী বছরে ১০ লাখ যুবক-যুবতীকে এই সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।” মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “গত পাঁচ বছর ছিল রূপান্তরের যাত্রা। আগের বন্যা পরিস্থিতির তুলনায় আজ ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। অসমে বাঁধের ওপর পাকা রাস্তা নির্মাণ একসময় কল্পনাও করা যেত না, কিন্তু জলসম্পদ বিভাগ তা বাস্তবায়ন করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রসূতি মৃত্যুর হার প্রতি এক লাখে ৪৮০ থেকে কমে বর্তমানে ১১০-এ নেমে এসেছে। রাজ্যে ১৭টি ক্যান্সার হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে আমরা রাজ্যের জন্য কাজ করেছি এবং জাতির পরিচয় রক্ষায় উদ্যোগ নিয়েছি। চরাইদেউ মৈদাম বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। বাগরুম্বা নৃত্যের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। আজ আমরা নতুন অসমের ভিত্তি গড়ে তুলেছি।”
অসমের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই সরকারের আমলে তিন লাখ অসমবাসী জমির পট্টা পেয়েছেন। চা শ্রমিকদেরও জমির পট্টা দেওয়া হবে। আগামী ১ মার্চ চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই সপ্তাহেই গुवাহাটির পাহাড়ি এলাকায় জমি প্রদান প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং প্রথমবারের মতো ১০ মার্চের আগেই সেখানে জমির পট্টা দেওয়া শুরু হবে। অ্যাডভান্টেজ অসম কর্মসূচির মাধ্যমে ৫.১৮ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগের জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ইতিমধ্যে ২,৮১,৬২১ কোটি টাকার বিনিয়োগ বাস্তবে আনা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে এক লাখ যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থান হবে। দেশে নতুন তিনটি আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অসম প্রথম স্থান অধিকার করেছে। রাজ্যপাল তাঁর ভাষণে প্রতিটি বিভাগের সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেছেন।”



