ভাষার অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের ন্যায়সঙ্গত দাবি

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ১৬ ফেব্রুয়ারি, সোমবার,
কটি ভাষা শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতিসত্তার আত্মপরিচয়, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রতীক। সেই ভাষাকে রক্ষা করা মানে একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে রক্ষা করা। আজ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজ যে দাবিগুলি নিয়ে অনশন কর্মসূচি শুরু করেছে—ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালু করা, ৩০০টি শিক্ষক পদ সৃষ্টি, কেন্দ্রীয় ওবিসি তালিকার গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশ এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি অটোনোমাস কাউন্সিল গঠন—এসব দাবি কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ অনশন হল প্রতিবাদের একটি সাংবিধানিক পদ্ধতি। যখন কোনও জনগোষ্ঠী বারবার আবেদন জানিয়েও ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন তারা এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। এটি সরকারের কাছে একটি সতর্কবার্তা—সময়ের মধ্যে সমস্যা সমাধান না হলে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

প্রথমত, মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। বিশ্বের উন্নত দেশগুলিও প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মাতৃভাষায় শিক্ষা শিশুর বোধগম্যতা বৃদ্ধি করে এবং তাদের মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষাভাষী ছাত্রছাত্রীরা আজও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালু করা হলে কেবল শিক্ষার মানই উন্নত হবে না, বরং ভাষাটির সংরক্ষণও নিশ্চিত হবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষক পদ সৃষ্টি করার দাবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা চালু করলেও যদি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকে, তবে সেই উদ্যোগ সফল হবে না। শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে একদিকে যেমন শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। এটি সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে সহায়ক হবে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ওবিসি তালিকায় গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশের দাবি দীর্ঘদিনের। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীগুলিকে সংরক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশ না হওয়ায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজ সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি অটোনোমাস কাউন্সিল গঠনের দাবি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ। একটি স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ গঠন হলে স্থানীয় সমস্যা সমাধান, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে। বিশেষ করে অসম-এর মতো বহুভাষিক ও বহু-সাংস্কৃতিক রাজ্যে এই ধরনের উদ্যোগ সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার এবং ভারত সরকারের উচিত বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *