বরাক তরঙ্গ, ৯ ফেব্রুয়ারি : শিলচর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তীর ভূমিকা ও দায়িত্ব পালন নিয়ে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে তীব্র অসন্তোষ ও সমালোচনা উঠে এল বরাক নাগরিক সংসদের সভায়। সোমবার শিলচর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত “নির্বাচনী সংলাপ” শীর্ষক আলোচনা সভায় শহরের সামগ্রিক অবনতি, নাগরিক দুর্ভোগ ও জনপ্রতিনিধির নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নিরঞ্জন দত্ত গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, শিলচরের বিধায়কের কাছে তাঁর বহু প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছরে বহু চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ বা সরাসরি কথা বলার কোনও সুযোগ পাননি। স্পষ্ট ভাষায় তিনি অভিযোগ করেন, বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তী তাঁর দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। অধ্যাপক দত্ত বলেন, একদিকে বিশুদ্ধ পানীয়জলের চরম সঙ্কট, অন্যদিকে সামান্য বর্ষণেই শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। চলমান নিকাশি প্রকল্পেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কোনও দিশা দেখা যাচ্ছে না। সোনাই রোড, শরৎ পল্লি, লিংক রোড ও জাতীয় সড়ক সংলগ্ন এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা উঁচু করায় দোকান ও বাড়িঘর নিচু হয়ে পড়েছে, ফলে জমাজল নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ হয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে বলে অভিযোগ।
গান্ধী শান্তি প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক অশোককুমার দেব শহরের পানীয়জল, রাস্তাঘাট, বন্যা ও নাগরিক পরিকাঠামোর বেহাল চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তথাকথিত উন্নয়নের নামে বারবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নেই। এখনও বহু এলাকায় বিশুদ্ধ পানীয়জল পৌঁছয় না। পুরনো পাইপলাইনের ফাটল দিয়ে নোংরা জল বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে পড়ছে। অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল ও চাঁদা আদায় নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন—এই অর্থ কোথায় যায়? তাঁর অভিযোগ, এ সব বিষয়ে বিধায়কের ভূমিকা সম্পূর্ণ নীরব।
শিলচর প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি রিতেন ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, “আর কতদিন শুধু কচুরিপানা তোলা আর ছবি তোলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন বিধায়ক?” যুব সমাজকর্মী ও সাংবাদিক রাজু দাস বলেন, বিধায়ককে দিনে পাওয়া যায় না, রাতের অন্ধকারেই দেখা মেলে। বাঙালি নবনির্মাণ সেনার কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রীতম দেব বলেন, শহরের পানীয় জলের সমস্যা আজও মেটেনি, এমনকি বিধায়কের নিজের বাড়ির কাছাকাছি এলাকাতেও জল সরবরাহ অনিয়মিত। আইনজীবী সৌরভ চক্রবর্তী বেকার সমস্যা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইউনাইটেড ফোরাম ফর বরাক ভ্যালি ডেভেলপমেন্ট-এর অনির্বাণ ভৌমিক বলেন, শিলচরের উন্নয়নের জন্য সৎ ও লক্ষ্যনির্দিষ্ট জনপ্রতিনিধি এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজ—এই দুইয়েরই প্রয়োজন। একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করে প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আইনজীবী কাজল দাস, অধ্যাপক নবেন্দু বণিক, সমাজকর্মী নিখিল দাস, কবি-সাংবাদিক স্মৃতি পাল নাথ, সমাজকর্মী রাজদীপ দাম, গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র শাশ্বত ভট্টাচার্য, সমাজকর্মী সুমন দে ও সাংবাদিক চয়ন ভট্টাচার্য। বক্তারা বলেন, গত পাঁচ বছরে বন্যা সহ নানা সমস্যায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে, কিন্তু কার্যকর প্রতিকার নেই।
নাগরিক সংসদের প্রধান সম্পাদক শংকর দে বলেন, যোগ্য ও দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি ছাড়া শিলচরের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। অনুষ্ঠানের সভাপতি সঞ্জিত দেবনাথ যুবসমাজের মধ্যে সরকারি চাকরি নিয়ে ক্রমবর্ধমান হতাশার কথা উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় শিল্পী শান্তিকুমার ভট্টাচার্য ও শিবানী দাসের সংগীত পরিবেশনা সভাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।



