বরাক তরঙ্গ, ১ ফেব্রুয়ারি : হার্টকেয়ার সোসাইটি অসম-এর দশম রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল। রবিবার গুয়াহাটি ডাউন টাউন হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে অত্যন্ত সফল ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। হৃদরোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সুস্থ জীবনযাপনের বার্তা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এই সম্মেলনে চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, গবেষক ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
এ দিন সকাল ৯টায় হার্টকেয়ার সোসাইটি অসম-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডাঃ নির্মলকান্তি ভট্টাচার্য সোসাইটির পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। পতাকা উত্তোলনের পর আয়োজক কমিটির সভাপতি ইকরামুল মজিদ সোসাইটির কর্মরাজি ও মানবসেবামূলক কার্যক্রম নিষ্ঠা, সততা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে পালনের শপথ পাঠ করান। এই পর্বে হার্ট কেয়ার সোসাইটি অসম-এর দীর্ঘদিনের সমাজমুখী কার্যক্রম ও হৃদরোগ সচেতনতার ক্ষেত্রে তাদের অবদানের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। এরপর অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের প্রাক্তন পরিচালক (মানব সম্পদ) অশোক দাস প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে তিনি হৃদযন্ত্রের শারীরিক গঠন ও কার্যকারিতার পাশাপাশি মানুষের আবেগ, মানসিক চাপ ও জীবনধারার সঙ্গে হৃদস্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেন। হাস্যরসাত্মক ও সাবলীল উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি শ্রোতাদের আকৃষ্ট করেন এবং বলেন, আধুনিক জীবনের দৌড়ঝাঁপ, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক উদ্বেগ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই ওষুধের পাশাপাশি ইতিবাচক মনোভাব, নিয়মিত শরীরচর্চা ও সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর বক্তব্যে সামগ্রিক সুস্থতার ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

সম্মেলনে মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অসম পশুচিকিৎসা ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্বাচিত উপাচার্য ড. নিরঞ্জন কলিতা। তিনি তাঁর তথ্যসমৃদ্ধ ও বিজ্ঞানভিত্তিক ভাষণে পুষ্টি সংক্রান্ত প্রচলিত নানা ভ্রান্ত ধারণা বা ‘মিথ’ দূর করার প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ জোর দেন। ড. কলিতা বলেন, হৃদরোগ নিয়ে অজ্ঞতা ও ভুল ধারণার কারণে বহু মানুষ প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে নিজেদের বঞ্চিত করছেন। তিনি মুরগির মাংস ও ডিমের মতো সহজলভ্য খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমানের পুষ্টিগুণ ব্যাখ্যা করে হৃদরোগের সঙ্গে এসব খাদ্যের সম্পর্ক নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলি দৃঢ়ভাবে খণ্ডন করেন। তাঁর মতে, সঠিক পরিমাণে ও সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে এই খাদ্যগুলি হৃদস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়; বরং প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে এগুলি শরীরের জন্য অপরিহার্য। তাঁর যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্য উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল হার্ট কেয়ার সোসাইটি অসম-এর স্মরণিকা ‘স্পন্দন’-এর উন্মোচন। বিশিষ্ট পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সঞ্জয় হাজরিকা এই স্মরণিকার উন্মোচন করেন। এ উপলক্ষে তিনি তাঁর প্রায় তিন দশকের সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। বিশেষ করে তিনি উদ্ভাবনী ‘বোট ক্লিনিক’ প্রকল্পের মাধ্যমে অসমের নদীদ্বীপ ও চর-চাপরি অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অগ্রণী উদ্যোগের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য পরিষেবা কেবল শহরকেন্দ্রিক হলে চলবে না; প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও তা পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি তিনি হৃদরোগ প্রতিরোধে সময়মতো সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
আয়োজক কমিটির উপ-সভাপতি ডাঃ বিজুজ জাহান সালেহা বেগম জানান, অত্যন্ত সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিতভাবে এই দশম রাজ্য সম্মেলনটি পরিচালিত হয়। তিনি সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে গৌরবান্বিত করার জন্য কলকাতার প্রখ্যাত চিকিৎসক ও সমাজসেবী ডাঃ এমকে দাস, Cardiological Society of India-এর প্রাক্তন সভাপতি সুবিমল ভট্টাচার্য, নয়াদিল্লির সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মরমী দাসসহ অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁদের উপস্থিতি সম্মেলনের মর্যাদা ও গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সম্মেলনের সমাপ্তি পর্বে মুকুল নারায়ণ বর্মন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, হার্ট কেয়ার সোসাইটি অসম আগামী দিনগুলিতেও হৃদরোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সুস্থ জীবনযাপনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করবে। এই ধরনের সম্মেলন সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে এবং চিকিৎসক ও সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।



