
বরাক তরঙ্গ, ২৬ জানুয়ারি : আজ দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস। খানাপাড়ায় রাজ্যপাল জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। অন্যদিকে ডিব্রুগড়ে প্রজাতন্ত্র দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন মুখ্যমন্ত্রী। পতাকা উত্তোলনের পর মুখ্যমন্ত্রী এক উদ্দীপনামূলক ভাষণ দেন। পদ্মশ্রী প্রাপ্ত ৫ জন অসমবাসীকে শুভেচ্ছা জানান তিনি। প্রজাতন্ত্র দিবসে জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকেও স্মরণ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “শুরু থেকেই কংগ্রেস সংবিধানের আত্মাকে আঘাত করার চেষ্টা করেছে। প্রথম পর্যায়ে বিআর আম্বেদকর সংবিধান সভায় স্থান পাননি, জওহরলাল নেহরু তার বিরোধিতা করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর প্রচেষ্টায় আম্বেদকর সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব পান। আধুনিক ভারতের অবিরাম অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই তা সম্ভব হয়েছে।” তিনি জানান, ৩০ জানুয়ারি ডিব্রুগড় বিধানসভা চৌহদে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে, যা স্থাপন করবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হবে নতুন বিধানসভা চৌহদ এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হবে। ডিব্রুগড়ে উচ্চ আদালতের সার্কিট বেঞ্চও স্থাপন করা হবে। আরও বলেন, “২০২৭ সালে অসমের জিডিপি ১০ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। গত পাঁচ বছরে উন্নয়নের নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছি। অসমের উন্নয়ন শুধু রাস্তা নির্মাণ নয়, বহুমাত্রিক অগ্রযাত্রাই আজ অসমের পরিচয়।”

তিনি দাবি করেন, পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের কারণে অসমের উন্নয়নে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং রাজ্যে তাদের সংখ্যা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমানে ১২টি জেলায় হিন্দুরা সংখ্যালঘু। রাজ্যে ৬৩ লক্ষ ৫৮ হাজার বিঘা জমি দখলদারদের কবলে রয়েছে। ২০২১ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে অসমে আর দখল চলবে না। দখলমুক্ত জমিতে মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেবের আবির্ভাব ক্ষেত্র নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের হাতে ৬৩.৫৮ লক্ষ বিঘা জমি রয়েছে। পূর্ববর্তী সরকার এই জমি উদ্ধারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেড় লক্ষের বেশি বিঘা জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে।” বিদেশি বহিষ্কারের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবে রূপ পেয়েছে বলে দাবি করে তিনি জানান, এখন জেলা প্রশাসকরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদেশিদের দেশ থেকে বহিষ্কার করতে পারেন।
অসম আন্দোলনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, জাতির জন্য ৮৬০ জন শহিদ আত্মত্যাগ করেছিলেন। শহিদ স্মারক নির্মাণ করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শহিদদের জাতীয় স্বীকৃতি দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বহুবিবাহ রোধে ঐতিহাসিক আইন পাস করেছি। একজন ব্যক্তি যেন বারবার বিয়ে করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হবে।” তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে আলোচনা করে অসমবাসীর স্বপ্ন পূরণে কাজ করা হচ্ছে। চরাইদেউ মৈদাম বিশ্ব ঐতিহ্য ক্ষেত্রের স্বীকৃতি পেয়েছে, হোলংগাপাড়ায় লাচিত বরফুকনের বিশাল মূর্তি স্থাপন হয়েছে, অসমীয়া ভাষা ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। বিহু ও ঝুমুর বিশ্বমঞ্চে পরিচিত হয়েছে, বাগরুমবা নৃত্যও বিশ্ব দরবারে পৌঁছেছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “লুইত নদীর ওপর চারটি সেতুর কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। অচিরেই নদীর তল দিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণ হবে। দুই বছরের মধ্যে কাজিরাঙ্গা এলিভেটেড করিডর সম্পন্ন হবে। গুয়াহাটি ও ডিব্রুগড়ের মধ্যে এক্সপ্রেস করিডর নির্মাণের স্বপ্ন রয়েছে, পাশাপাশি শিলিগুড়ি-গুয়াহাটি করিডরের পরিকল্পনাও রয়েছে।”
তিনি জানান, মরাণে জরুরি অবতরণ সুবিধাযুক্ত রানওয়েতে প্রধানমন্ত্রী অবতরণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “অসমের কোনো যুবক যেন দুর্নীতির শিকার হয়ে সন্ত্রাসবাদের পথে না যায়। আমরা শুধু এক লক্ষ চাকরি দিইনি, স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ দিয়েছি। ফেব্রুয়ারি মাসে আরও হাজার হাজার যুবক চাকরি পাবে।” তিনি আরও জানান, আগামী ফেব্রুয়ারিতে এক লক্ষ যুবককে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। চা শিল্প অসমকে বিশ্বে পরিচিত করেছে, কিন্তু ২০০ বছরের চা শিল্পের শ্রমিকরা গুরুত্ব পাননি। এখন তাদের জমির পট্টা, চাকরিতে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের নতুন প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে ভোটব্যাংকের রাজনীতির বদলে উন্নয়নের পথে এগোনোর জন্য ভোট দিতে হবে। অসমের নতুন প্রজন্ম বহুবিবাহ চায় না, তারা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) চায়।” তিনি জানান, রাজ্যের প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে এবং প্রোটন থেরাপির মতো উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাও উপলব্ধ হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “অন্ধকার অতীত থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। সংগ্রাম করেই জাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আবার কখনো পরাজিত হওয়া যাবে না। গত পাঁচ বছরে লাচিতের আদর্শে কাজ করেছি। আপনাদের আশীর্বাদে নতুন অসমের স্বপ্ন দেখছি।”



