প্রতিষ্ঠার ত্রিশ বছর পরও কেন সরকারিভাবে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার লিখিত ইতিহাস প্রকাশে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষ, জবাব চায় প্রাক্তনী আকসা

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ২৩ জানুয়ারি : বরাকের বিশিষ্ট সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক বিকাশ চক্রবর্তীর অক্লান্ত শ্রম ও প্রচেষ্টায় আজ প্রকাশিত হয়েছে “আসাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত” শিরোনামে একটি তথ্যসমৃদ্ধ বই। এরজন্য লেখক এবং প্রকাশনী সংস্থা ‘দিগন্ত প্রকাশনী’ কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি এযাবৎ এই ব্যাপারে ব্যর্থতার জন্য আসাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনা করে তাঁদের জবাবদিহি করতে হবে বলে দাবি জানালেন ‘ প্রাক্তনী আকসা ‘ সংগঠনের সদস্যরা।

এদিন সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ‘প্রাক্তনী আকসা’ এর মুখ্য আহ্বায়ক হাইলাকান্দি এসএস কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ হিলাল উদ্দিন লস্কর বলেন, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৩ অব্দি আকসার নেতৃত্বে জাতিধর্ম নির্বিশেষে আপামর বরাক বাসীর একনাগাড়ে আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৯৪ সালে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়। এই আন্দোলনের পেছনে বহু মানুষের আত্মত্যাগ ও মূল্যবান সময় ব্যায়িত হয়েছে। পুলিশের গুলিতে জখম হয়েছেন একাধিক যুবক। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হলেও আজ অব্দি সরকারি ভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার ইতিহাস লিখিত ভাবে লিপিবদ্ধ বা প্রকাশ করতে ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন এই প্রস্তাব যে উঠেনি বা চেষ্টা নেওয়া হয়নি তেমনও নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য্যের উদ্যোগে প্রয়াত অধ্যাপক সুবীর করের দায়িত্বে এই ব্যাপারে একটি কমিটি গঠন হয়েছিল এবং সেই কমিটি এই ইতিহাসের একটি পান্ডুলিপিও প্রস্তুত করে কতৃপক্ষের হাতে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু তপোধীর বাবু অবসর গ্রহণ করার পর একাধিকবার এই পান্ডুলিপি প্রকাশের জন্য ছাপাখানায় গেলেও কোন রহস্যময় কারণে এটি বারবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনি বলেন লিখিত ইতিহাস না থাকার কারণেই প্রশান্ত চক্রবর্তীর মতো ব্যাক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে এটিকে আসাম আন্দোলনের ফসল বলার সাহস পান। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার একাংশ উগ্র জাতীয়তাবাদীরাও একই ন্যারেটিভ প্রচার করেন। সরকারি ওয়েবসাইটেও ইচ্ছাকৃতভাবে এই ভুল তথ্য পরিবেশিত হয়। অথচ যা প্রকৃত সত্য তা হল বরাকের এই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আন্দোলনের বিনিময়ে তেজপুরে কোন আন্দোলন ছাড়াই একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাড়পত্র দেয় তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার। তিনি বলেন এই সমস্ত ইতিহাসই বিকাশ চক্রবর্তীর সদ্য প্রকাশিত বইয়ে লিপিবদ্ধ রয়েছে,যা পাঠকমহলে আদৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

প্রাক্তনী আকসার আরেক আহ্বায়ক পঙ্কজ কান্তি দেবরায় বলেন যে ভাষা আন্দোলনের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন বরাকের প্রতিবাদী আন্দোলনের এক অন্যতম মাইলস্টোন,যা এই অঞ্চলের ইতিহাস গবেষক সহ সমগ্র দেশের নাগরিকদের জানা উচিত বলে তিনি মনে করেন। বিশেষতঃ আজকের নতুন প্রজন্ম যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে বা অধ্যয়নরত তাঁরা যাতে এই ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকে সেজন্য প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার ইতিহাস লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং তা ফাউন্ডেশন কোর্সে পড়ান হয়। কিন্তু এরকম একটি সমৃদ্ধ আন্দোলনের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও  আসাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেন বারবার টালবাহানা করে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেননি তার জন্য অবশ্যই তাদের জবাবদিহি করতে হবে। তিনি বলেন, প্রশান্ত চক্রবর্তীর বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে সারা উপত্যকা জুড়ে সমালোচনা হবার পর মূলতঃ আসাম বিশ্ববিদ্যালয় অশিক্ষক কর্মচারী পরিষদের চাপে অধ্যাপক অশোক সেনকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনিও এই ব্যাপারে এখন অবদি নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তিনি বলেন বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের এই ভূমিকা অবশ্যই ধিক্কারযোগ্য এবং এটি প্রকারান্তরে বরাক বাসীকে অবমাননা ও অপমান করার সামিল। তিনি বলেন যে সাংবাদিক বিকাশ চক্রবর্তীর বেসরকারি প্রয়াসে যে বই প্রকাশিত হয়েছে তা তথ্যবহুল এবং এতে প্রকৃত ইতিহাস সুনির্দিষ্ট ভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাই এই পুস্তককেই স্বীকৃতি দিয়ে ফাউন্ডেশন কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করুক কর্তৃপক্ষ। তাঁতে অন্তত তাঁদের এযাবৎ ব্যার্থতার দায় কিছুটা লাঘব হবে বলে এদিন মন্তব্য করেন তিনি।

প্রাক্তনী আকসার অপর আহ্বায়ক গীতেশ পাল বলেন, আকসার আন্দোলনে যাঁরা জানপ্রাণ বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে ছিলেন, তাঁদের বরাক বাসী যে স্বীকৃতি ও সম্মান দিয়েছেন এর চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু হতে পারেনা। তবু তিনি  আসাম অশিক্ষক কর্মচারী পরিষদের সদস্যদের তাঁদের সম্মান জানানোর জন্য এদিন আবার ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য বোরো জননেতা উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্ম বোরোল্যান্ড এলাকার ৪৫ লক্ষ জনগনের সহমত সহ তাঁদের সমর্থন জানিয়েছিলেন,যে ইতিহাস বরাকবাসী চিরকাল মনে রাখবে। তিনি বলেন  তাঁদের প্রচেষ্টায় এবং  প্রাক্তন উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য্যের জমি বরাদ্দ করার জন্য ইতিমধ্যে উপেন্দ্র ব্রহ্মের স্মৃতিতে একটি প্রেক্ষাগৃহ স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হয়েছে। এতে ৫০ লক্ষ টাকা আর্থিক অনুদান দিয়েছিলেন বিটিসির তৎকালীন মুখ্য আধিকারিক হাগ্রামা মহিলারি। গীতেশ পাল আরো বলেন যে আকসার আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন বরাকের প্রায় সমস্ত প্রান্তের জনগন। বিশেষতঃ হাইলাকান্দি জেলার আকসার তৎকালীন সভাপতি কমরুল আলম চৌধুরী (লাবলুদা) ও সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত নীলোৎপল গুপ্তের অবদান তাঁরা চিরকাল মনে রাখবেন।

প্রাক্তনী আকসার পক্ষ থেকে অন্যান্য দের মধ্যে এদিন উপস্থিত ছিলেন মারুক আহমেদ, মুজিবুর রহমান,সজল দেবরায় প্রমুখ। প্রাক্তনী আকসার পক্ষ থেকে সজল দেবরায় এক প্রেস বার্তায় এই খবর জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *