জনসংযোগ, শিলচর।
বরাক তরঙ্গ, ৪ জানুয়ারি : চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকার শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দূরদর্শী ও সংবেদনশীল নেতৃত্বে সেই লক্ষ্য আজ বাস্তব রূপ পাচ্ছে, এমনই মন্তব্য করলেন রাজ্যের খাদ্য, গণবণ্টন ও ভোক্তা বিষয়ক, খনিজ ও খনিজ সম্পদ এবং বরাক উপত্যকা উন্নয়ন বিভাগের মন্ত্রী কৌশিক রায়। শনিবার কাছাড় জেলার দেওয়ান টি এস্টেটে স্বাস্থ্যবান শ্রমিক যোজনা’র পাইলট প্রকল্পের সূচনা উপলক্ষে এক জনসমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, চা-বাগানের প্রান্তিক শ্রমিক পরিবারগুলিও এখন রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল স্রোতে যুক্ত হচ্ছেন।
সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, এক সময় চা-বাগান এলাকায় মানসম্মত স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছনো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আজ পরিকল্পিত নীতি ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার ফলে সেই ব্যবধান দ্রুত ঘুচছে। তাঁর কথায়, চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকার শ্রমজীবী মানুষদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের কল্যাণ নয়, বরং রাজ্যের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিতকে আরও মজবুত করা। মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সুস্পষ্ট দিশানির্দেশে সরকার স্বাস্থ্য পরিষেবাকে শহরকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে প্রান্তিক এলাকায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মন্ত্রী রায় আরও বলেন, স্বাস্থ্যবান শ্রমিক যোজনা কোনও এককালীন কর্মসূচি নয়, বরং এটি রাজ্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জনমুখী শাসনদর্শনেরই অংশ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চা-বাগান এলাকায় রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, সময়মতো চিকিৎসা ও ধারাবাহিক স্বাস্থ্য নজরদারির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের চা-অর্থনীতির ভিত গড়ে তোলা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অসমের মোট ২০টি চা-বাগানের মধ্যে দেওয়ান টি এস্টেটকে পাইলট প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে রাজ্যের অন্যান্য চা-বাগান এলাকায় একই মডেলে স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারণের পথ দেখাবে। সরকারের লক্ষ্য কেবল পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই নয়, বরং তা যেন দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর হয় সে বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
চা-বাগান শ্রমিকদের সার্বিক উন্নয়নে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাকে একসূত্রে বেঁধে এগোনোর কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী রায়। আয়ুষ্মান ভারত, আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির, পুষ্টি সহায়তা এবং বিভিন্ন কল্যাণমূলক যোজনার মাধ্যমে শ্রমিক পরিবারগুলির জীবনমান উন্নয়নে সরকার সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে তিনি জানান। এই ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলেই চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকায় স্বাস্থ্য সচেতনতা যেমন বাড়ছে, তেমনই সরকারের উপর মানুষের আস্থাও আরও দৃঢ় হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে কাছাড়ের বিদায়ী জেলা আয়ুক্ত মৃদুল যাদব, আইএএস-এর ভূমিকাকেও বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেন মন্ত্রী কৌশিক রায়। জেলার বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর প্রশাসনিক নিষ্ঠা ও সমন্বয়মূলক উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ক্ষেত্র পর্যায়ে প্রশাসনের আন্তরিকতাই সরকারি যোজনার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
চা-বাগান এলাকায় স্বাস্থ্য পরিকাঠামো আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে মন্ত্রী রায় ঘোষণা করেন, কাছাড় জেলার ২৭টি চা-বাগান হাসপাতালকে আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরে উন্নীত করতে প্রতিটি হাসপাতালের জন্য ৩ লক্ষ টাকা করে অনুমোদন করা হয়েছে। পাশাপাশি লক্ষীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অধীনে সাতটি চা-বাগান হাসপাতালের মেরামতি ও সংস্কার কাজের শিলান্যাসও করা হয় এ দিন।

এদিন সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেলা আয়ুক্ত মৃদুল যাদব বলেন, স্বাস্থ্যবান শ্রমিক যোজনার সুস্পষ্ট নির্দেশিকা ও বাস্তবমুখী লক্ষ্য চা-বাগান এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবার গুণগত মানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে। জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ একযোগে কাজ করে “সবার জন্য স্বাস্থ্য” লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি জানান।
এর আগে স্বাস্থ্য বিভাগের যুগ্ম সঞ্চালক ডা. শিবানন্দ রায় কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসাই এই যোজনার মূল লক্ষ্য। চা-বাগান শ্রমিকদের মধ্যে প্রচলিত ও প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলির উপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা নেবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
এই উপলক্ষে দেওয়ান টি এস্টেটে এক বৃহৎ স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ চিকিৎসকের মাধ্যমে বহির্বিভাগ পরিষেবা, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, চক্ষু পরীক্ষা, অসংক্রামক রোগ ও ম্যালেরিয়া স্ক্রিনিং, শিশুদের টিকাকরণ এবং বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হয়। বিভিন্ন বিভাগ মিলিয়ে মোট ২৯৩ জন রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।
অনুষ্ঠানস্থল দেওয়ান নিছলাইন মেইন দুর্গা মণ্ডপে লক্ষীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ৯ জন যক্ষ্মা রোগীর হাতে নিক্ষয় পোষণ কিট তুলে দেওয়া হয়। জাতীয় যক্ষ্মা নির্মূল অভিযানের আওতায় এই পুষ্টি সহায়তা রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষাকেও আরও মজবুত করবে বলে জানান আধিকারিকেরা। অনুষ্ঠানে লক্ষীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা, লক্ষীপুর ও হরিনগর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আধিকারিকেরা, এনএইচএম-এর জেলা কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রাহুল ঘোষ সহ বিভিন্ন বিভাগের আধিকারিকগন উপস্থিত ছিলেন।



