কাছাড়ে আবেগঘন বিদায় জেলা আয়ুক্ত মৃদুল যাদবকে

জনসংযোগ, শিলচর।
বরাক তরঙ্গ, ৩ জানুয়ারি : প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝেই শনিবার যেন খানিকটা থমকে দাঁড়িয়েছিল কাছাড় জেলা প্রশাসন। শিবসাগর জেলার জেলা আয়ুক্ত হিসেবে বদলির প্রেক্ষিতে বিদায়ী জেলা আয়ুক্ত মৃদুল যাদব (আইএএস)কে ঘিরে শিলচরে জেলা আয়ুক্ত কার্যালয়ের নবনির্মিত সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হল এক আবেগঘন বিদায় সংবর্ধনা। প্রশাসনিক শিষ্টাচার ছাড়িয়ে এই অনুষ্ঠান পরিণত হয় স্মৃতি, কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের এক হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তে, যেখানে ফিরে দেখা হল এমন এক কর্মকাল, যা স্বল্প সময়ের মধ্যেই কাছাড় জেলায় রেখে গেছে সুদৃঢ় ও ইতিবাচক প্রশাসনিক ছাপ।

২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কাছাড় জেলার জেলা আয়ুক্ত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মৃদুল যাদব নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এক লক্ষ্যনিষ্ঠ, শান্ত অথচ দৃঢ় প্রশাসক হিসেবে। সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, সংবেদনশীল সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং মানুষের সমস্যাকে প্রশাসনের কেন্দ্রে রাখার মানসিকতাই ছিল তাঁর কর্মপদ্ধতির মূল ভিত্তি। জনসাধারণের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব কমানো এবং পরিষেবা প্রদানে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই তিনি স্বল্প সময়ে জেলার বিভিন্ন স্তরে আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন।

অনুষ্ঠানের এক বিশেষ মুহূর্তে বিদায়ী জেলা আয়ুক্তকে ঐতিহ্যবাহী উত্তরীয় পরিয়ে সম্মান জানানো হয়। পাশাপাশি কাছাড়ের সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকী নিদর্শন সংবলিত একটি স্মারক তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতে যা যেন জেলার পক্ষ থেকে এক নীরব কৃতজ্ঞতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

এদিন বিদায়ী বক্তব্যে মৃদুল যাদব আবেগ সংবরণ করে কাছাড়ে কাটানো সময়ের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, এই জেলা তাঁকে যেমন পেশাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে, তেমনই দিয়েছে গভীর ব্যক্তিগত তৃপ্তি। তাঁর মতে, কার্যকর প্রশাসন কেবল নীতি-নির্দেশিকা বা বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তার মূল ভিত্তি মানুষের আস্থা, দলগত সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যার প্রতি সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি। বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, কাছাড়ের সামাজিক বৈচিত্র্য, সহনশীলতা ও সমষ্টিগত মানসিকতা তাঁর প্রশাসনিক যাত্রাকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।

জেলার বিভিন্ন বিভাগের আধিকারিক ও কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিদায়ী জেলা আয়ুক্ত বলেন, তাঁর কর্মকালে যে অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে, তা একক প্রচেষ্টার ফল নয় বরং সম্মিলিত উদ্যোগ ও যৌথ দায়িত্ববোধেরই প্রতিফলন। জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়, সম জেলা আয়ুক্তের কার্যালয়, চক্র আধিকারিক এবং প্রথম সারির কর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলিকে বাস্তব রূপ দিতে তাঁদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। একই সঙ্গে তিনি নৈতিক ও মানবিক প্রশাসনের উপর গুরুত্ব আরোপ করে আধিকারিকদের জনগণের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সহজপ্রাপ্য, সহানুভূতিশীল ও সমাধানমুখী হওয়ার আহ্বান জানান।
নেতৃত্বের প্রসঙ্গে মৃদুল যাদব বলেন, প্রশাসনের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে দলকে ক্ষমতায়িত করার মধ্যে এবং এমন কর্মপরিবেশ গড়ে তোলায়, যেখানে প্রত্যেকে নিজের কাজের মূল্য ও গুরুত্ব অনুভব করতে পারে। তরুণ আধিকারিকদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল ক্ষেত্রভিত্তিক বাস্তবতা থেকে নিয়মিত শেখা, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা এবং সিভিল সার্ভিসের মৌলিক মূল্যবোধ অটুট রাখা।

এর আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা উন্নয়ন আয়ুক্ত রাজীব রায়,  লক্ষীপুরের সমজেলা আয়ুক্ত ধ্রুবজ্যোতি পাঠক; ধলাই সমজেলা আয়ুক্ত রক্তিম বরুয়া সহ অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্তগন ও সহকারী আয়ুক্ত বহ্নিখা চেতিয়া, জুনালী দেবী; লক্ষ্যজিৎ গগৈ।এবং দীপা দাস, বিদায়ী জেলা আয়ুক্তের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা সকলেই জেলা আয়ুক্ত মৃদুল যাদবের নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগকে সম্মানের বলে উল্লেখ করে তাঁর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তাঁদের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে বিদায়ী জেলা আয়ুক্তের শান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণ, শৃঙ্খলাবোধ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে উদ্ভাবন ও কাজের দায়বদ্ধতাকে ধারাবাহিকভাবে উৎসাহ দেওয়ার মানসিকতার কথা।
এছাড়াও জেলা প্রশাসন কর্মচারী সমিতির প্রতিনিধিরা যাদের মধ্যে ছিলেন বিক্রমজিৎ চক্রবর্তী, রজত ভট্টাচার্য, নাজির, প্রবীর কুর্মি, তারাশঙ্কর দাস প্রমুখ বিদায়ী জেলা আয়ুক্তের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁদের কথায়, মৃদুল যাদব ছিলেন এক সহজপ্রাপ্য ও সহানুভূতিশীল প্রশাসক, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক সৌহার্দ্য, মানবিকতা ও পেশাদারিত্বকে সর্বদা সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *