পনেরো বছরে ‘উত্তীয়’, বাংলা বইয়ের পাঠক-সংকটে উদ্বেগ সাহিত্যিকদের

Spread the news

ছোট পত্রিকার গুরুত্ব ও লেখকের দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরলেন অতীন দাশ

পিএনসি, শিলচর।
বরাক তরঙ্গ, ১৪ অক্টোবর : বাংলা বইয়ের প্রতি পাঠকের অনাগ্রহ এবং ছোট পত্রিকা প্রকাশের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানালেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংবাদিকেরা। শিলচরের শ্যামানন্দ আশ্রম রোডে বুধবার সন্ধ্যায় ‘উত্তীয়’ সাহিত্য পত্রিকার ২০২৬-২৭ সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বাংলা বইয়ের পাঠক-সংকট, লেখকের দায়বদ্ধতা এবং ছোট পত্রিকার ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পত্রিকাটির ১৫ বছরের যাত্রা উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সাহিত্যচর্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে সাহিত্য পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বও উঠে আসে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বরাক উপত্যকা সাংবাদিক সংস্থার সভাপতি ড. হারাণ দে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক অতীন দাশ। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক অমল গুপ্ত, গল্পকার ঝুমুর পাণ্ডে, লেখক সুদীপ্ত দেবরায়, কবি শতদল আচার্য, পত্রিকার সম্পাদিকা স্নিগ্ধা চ্যাটার্জি বিশ্বাস এবং সহ-সম্পাদিকা সবরী চৌধুরী। উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাপী রায়। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন স্নিগ্ধা চ্যাটার্জি বিশ্বাস।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অতীন দাশ ‘উত্তীয়’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সজল বিশ্বাসের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সজল বিশ্বাস যে সাহিত্যচর্চার বীজ বপন করেছিলেন, তা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে লালন করে চলেছেন বর্তমান সম্পাদিকা স্নিগ্ধা চ্যাটার্জি বিশ্বাস। শিলচরে একসময় বই প্রকাশের সুযোগ সীমিত ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, সেই পরিস্থিতিতে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ‘সেঞ্চুরি লিটারেচার’ প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। ওই সংস্থা থেকে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আরেক আকাশ’ এই বাড়ি থেকেই প্রকাশিত হয়।

বাংলা বই পড়ার প্রতি অনাগ্রহ প্রসঙ্গে অতীন দাশ বলেন, শিক্ষিত বাঙালির বাংলা বই পড়ার অনীহা নতুন কোনও সমস্যা নয়। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সময়েও এই প্রবণতা নিয়ে আক্ষেপ ছিল। তাঁর মতে, লেখালেখি কেবল পরিচিতি অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও সময়ের দলিল সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। নিজের প্রায় ৮০টি বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বই প্রকাশের ক্ষেত্রে লেখককেও উদ্যোগী হতে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বন্ধুদের সহযোগিতায় নিজের বই প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। বহু প্রতিষ্ঠিত লেখকের সাহিত্যজীবন গড়ে ওঠার পিছনে ছোট পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সম্পাদিকা স্নিগ্ধা চ্যাটার্জি বিশ্বাস সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, লেখকের দীর্ঘ পরিশ্রমে বই প্রকাশিত হলেও পাঠকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। গল্পকার ঝুমুর পাণ্ডে পত্রিকা প্রকাশে সম্পাদিকার নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, প্রতিটি লেখা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এক একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকে।

সাংবাদিক অমল গুপ্ত বলেন, পত্রিকা ছোট না বড়, সেটি বড় কথা নয়; বরং সেখানে প্রকাশিত লেখার সামাজিক উপযোগিতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি ছোট পত্রিকা প্রকাশের পথে থাকা নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. হারাণ দে সম্পাদিকা স্নিগ্ধা চ্যাটার্জি বিশ্বাসের নিরলস পরিশ্রমের প্রশংসা করে ভবিষ্যতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তাঁর বক্তব্যেও ছোট পত্রিকা প্রকাশের কঠিন বাস্তবতা বিশেষভাবে উঠে আসে।

সব মিলিয়ে, ১৫ বছরের পথচলা অতিক্রম করে ‘উত্তীয়’র নতুন সংখ্যা প্রকাশের অনুষ্ঠান বাংলা সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, ছোট পত্রিকাকে উৎসাহিত করা এবং বাংলা বইয়ের পাঠক বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *