৩ সেপ্টেম্বর : গত ৪৮ ঘণ্টা যাবৎ জিডিপি বৃদ্ধির হারের যে অঙ্ককে অর্থনীতির উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন হিসাবে মোদি সরকার প্রচার করে চলেছে, তাতে কি কারচুপি রয়েছে? এই প্রশ্ন উঠছে। আর শুধু কংগ্রেস সহ অন্যান্য বিরোধীরা নয়, এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন মোদি সরকারেরই প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ। গত অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপি বৃদ্ধিহার, জিডিপির অর্থমূল্য এবং ক্রয় প্রবণতার তূল্যমূল্য বিচার করে তাঁর দাবি, জিডিপির এই রিপোর্ট ঠিক নয়। ৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধিহারের আনন্দে উৎফুল্ল হওয়ার কিছুই নেই। কারণ গত বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকেও জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৮ শতাংশই। পরে তা সংশোধন করে বলা হয় ৬.৯ শতাংশ। ঠিক একইভাবে, মোট জিডিপির পরিমাণও আগের বছরের ওই কোয়ার্টারে বলা হয়েছিল ৮৬ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু পরে সেটা হয়ে যায় ৮০ লক্ষ কোটি। গর্গের সাফ দাবি, এই দুই পরিসংখ্যানই কমিয়ে আনার কারণ কী? একটাই বিষয় প্রতিষ্ঠা করা—চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে অর্থনীতি এক ধাক্কায় দারুণ উন্নতি করে ফেলেছে। গর্গ বলেছেন, ‘এবার প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধিহার (কারেন্ট প্রাইস) খুব বেশি হলে ২.৬ শতাংশ হয়েছে। আর মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পণ্য-পরিষেবার মূল্য অ্যাডজাস্ট করলে জিডিপি বৃদ্ধির হার (রিয়েল টার্ম) প্রায় শূন্য বললেও ভুল হবে না।’ গর্গ শুধু মোদি সরকারের প্রাক্তন অর্থসচিব নন, বিশ্ব ব্যাংকের এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর এবং মোদি জমানাতেই বিদ্যুৎ সচিবের দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। তাই তাঁর এই বিস্ফোরক বিশ্লেষণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিরোধীরা। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেছেন, ‘প্রোপাগান্ডা দিয়ে জিডিপির চিত্র বদলে ফেলা যায়। কিন্তু অর্থনীতি বদলানো যায় না।’ এখানেই শেষ নয়। মুখ খুলেছেন প্রাক্তন রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর রঘুরাম রাজনও। তাঁর বক্তব্য, ‘এতই যদি উন্নত জিডিপি হয়, তাহলে কর্মসংস্থান কোথায়? শিল্পলগ্নির জোয়ার কোথায়? এফডিআই আসছে না কেন? বিদেশি বিনিয়োগ পালাচ্ছে কেন?’
জিডিপি নিয়ে প্রচারের উড়ান ধাক্কা খাওয়ায় বস্তুতই চাপে মোদি সরকার। যদিও তারা প্রত্যাঘাতের পথই নিয়েছে। বিজেপির বক্তব্য, ‘এটা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করার পরিকল্পনা।’ সরকারি সূত্রে বলা হয়েছে, গর্গ প্রথমেই ভুল করেছেন। সেই ভুলের উপর দাঁড়িয়ে তিনি মিথ্যা দাবি করছেন। বিগত আর্থিক বছরে জিডিপি মাপকাঠির ভিত্তিবর্ষ ও মানদণ্ড ছিল আলাদা। সেটা বদলে ফেলা হয়েছে। ২০২২ সালের যে নয়া মাপকাঠি, তা কার্যকর হয়েছে চলতি অর্থবর্ষেই। গর্গ কিন্তু পরিষ্কার বলছেন, ‘মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত হার এবং ক্রয় প্রবণতা—এই দু’টি মাপকাঠিকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকরভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। গত বছরের রিপোর্ট এবং এই বছরের রিপোর্টের তুলনা করলেই স্পষ্ট, আম জনতার ক্রয় প্রবণতা কমেছে। অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থাটা সরকারের উপলব্ধি করা উচিত। সংখ্যার মাধ্যমে চমক দেখালে অর্থনীতির ভেতরটা ফাঁপাই থেকে যাবে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, শেয়ার বাজারের টালমাটাল পরিস্থিতি, টাকার পতন, গ্রাম ও শহরে আর্থিক লেনদেন কমে যাওয়া—এই সবেরই যোগফল আর্থিক মন্দার হাতছানি। কিন্তু সেই আশঙ্কার সম্পূর্ণ বিপরীত পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে জিডিপি রিপোর্ট।’
ফলে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল যতই দাবি করুন, ‘এঁদের কোনো কাজ নেই। শুধু টিভি চ্যানেলে বসে বাজার গরম করেন’… তাতে চিঁড়ে ভিজছে না। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল বা আম আদমি পার্টি—প্রত্যেকেই সরকারকে প্রবলভাবে চেপে ধরেছে। বলছে, শেষ পর্যন্ত জিডিপি সংখ্যাতেও চুরি? বাস্তব আর সরকারের রিপোর্টের মধ্যে ফারাক কিন্তু বিস্তর।



