বরাক তরঙ্গ, ২২ আগস্ট : শিলচর শহরের প্রাণকেন্দ্রে গড়ে উঠা বিলপারের ঐতিহ্যবাহী ও প্রায় দুশো বছরের প্রাচীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউ আখড়ায় ২৪ আগস্ট সোমবার থেকে শুরু হবে পাঁচ দিবসীয় ঝুলন যাত্রা উৎসব, চলবে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিবছরের ন্যায় এবারের ঝুলন উৎসবে থাকছে ভক্তিমূলক গান, সঙ্গীতালেখ্য, নৃত্যনাট্য, ঝুলন গান ইত্যাদি।
পাঁচ দিবসীয় ঝুলন যাত্রা উৎসবের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরতে গিয়ে শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউ আখড়ার সেবায়েত অংশু কুমার রায় জানান, ১২৪৩ বাংলায় রাধামাধব আখড়া স্থাপিত হওয়ার পর থেকে ঝুলন যাত্রা চলে আসছে। তিনি বলেন উৎসবের মুহুর্তে রাধামাধবের যে পোশাক পরানো হয় তা পাঁচ দিন পাঁচটা থিমের উপর নির্ভর করে। প্রথম দিন ‘রাধাকুণ্ডে সুবল বেশে রাই মিলন’, দ্বিতীয় দিন ‘যমুনা পুলিনে গোষ্ঠ বিহার’, তৃতীয় দিন ‘নিকুঞ্জে রাই রাজা’, চতুর্থ দিন ‘লবঙ্গ কুঞ্জে নটবর বেশ’ এবং পঞ্চম দিন অর্থাৎ অনুষ্ঠানের শেষ দিনের থিম হচ্ছে ‘রাজ বেশ’ । সেবায়েত অংশু কুমার রায় আরও বলেন এবারের উৎসবে প্রত্যেক দিন নানা ধরণের কীর্তন, ঝুলন গান, নৃত্যনাট্য, সঙ্গীতালেখ্য পরিবেশিত হবে। তিনি বলেন সোমবার প্রথম দিনের কার্য্যসূচীর মধ্যে রয়েছে মনোরঞ্জন মালাকার ও সহ শিল্পীদের পরিবেশিত ঝুলন গান। মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিন উত্তমাসা আর্ট ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিবেশিত হবে সঙ্গীতালেখ্য, শিল্পী হিসাবে থাকবেন প্রদীপ আচার্য্য ও সহ-শিল্পীরা। বুধবারের অনুষ্ঠানসূচীর মধ্যে রয়েছে বিভাঙ্গণ পরিচালিত কীর্তনাঙ্গীক নৃত্যানুষ্ঠান, এতে শিল্পী হিসাবে থাকবেন তথাগত দাস ও সহ-শিল্পীরা। বৃহস্পতিবার নিক্কণ সংগীত বিদ্যালয় পরিবেশিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিল্পী হিসাবে থাকবেন শুভ্রাংশু নাথ মজুমদার। উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ ২৮ আগস্ট শুক্রবার বিশেষ আকর্ষণ হিসাবে পুষ্পাঙ্গণ সঙ্গীত কলাকেন্দ্র পরিচালিত কীর্তনাঙ্গীক নৃত্যানুষ্ঠান, এতে শিল্পী হিসাবে থাকবেন উৎপল বিশ্বাস সহ অন্যান্যরা। প্রতিদিন রাতে থাকবে ঝুলন গান, সঙ্গীতালেখ্য ও ভক্তিমূলক নৃত্যানুষ্ঠানের আসর, জানান অংশুবাবু।
এদিকে, শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউ আখড়ার সেবায়েত ও বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রতিনিধি অংশুকুমার রায় জানিয়েছেন, ১৮৩৬ সালে তাঁর পূর্ব পুরুষ লোচনরাম সাহা, যিনি বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে ললিতা দাস বৈষ্ণব নাম ধারণ করেন, এই আখড়ার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন তদানীন্তন ভারতবর্ষ ( বর্তমান বাংলাদেশের হবিগঞ্জের বাসিন্দা), যিনি ব্যবসার কাজে এসে শিলচরে স্থায়ীভাবে ব্যবসা শুরু করেন পরে ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে ধন-সম্পত্তি-প্রাচুর্য ভরে ওঠে। তিনি রাধামাধব আখড়া নির্মাণ করে সমস্ত সম্পত্তি রাধাকৃষ্ণের নামে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসাবে দান করে দেন এবং তাঁর বংশধরদের সেই আখড়া পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে যান। ললিতা দাস বৈষ্ণবের দানকৃত দেবোত্তর সম্পত্তির উপর ভিত্তি করেই কাছাড় জেলায় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে গড়ে ওঠে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে নারীদের শিক্ষায় উৎসর্গীকৃত পাঠশালা থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে-ললিতা দাস পাঠশালা, রাধামাধব বালিকা বিদ্যালয়, রাধামাধব বুনিয়াদি বিদ্যালয় ও রাধামাধব কলেজ।
অংশুবাবু আরও জানান, ঝুলন উৎসব তাদের পরম্পরাগত একটা উৎসব এবং সেই ধারা অব্যাহত রেখে প্রতি বছর তারা ঝুলন উৎসব পালন করে আসছেন। ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউ আখড়ার সেবায়েত হিসাবে তিনি পাঁচ দিবসীয় অনুষ্ঠানকে সফল রূপ দিতে আপামর ভক্তপ্রাণ নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কামনা করেছেন, তৎসঙ্গে প্রতিদিন অনুষ্ঠান শেষে মহাপ্রসাদ গ্রহণ করারও আহ্বান জানিয়েছেন।



