মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ২ জুন : পথে বেরোলেই দেখা যায় অসংখ্য মোটরসাইকেল ছুটে চলেছে ব্যস্ত সড়কে। কিন্তু সেই গতির সঙ্গেই প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। একটি মুহূর্তের অসাবধানতা কিংবা একটি ছোট ভুল সিদ্ধান্ত কেড়ে নিতে পারে একটি মূল্যবান জীবন। আর সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই সড়ক নিরাপত্তা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক ব্যতিক্রমী, মানবিক এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করল পাথারকান্দি পুলিশ। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের শুধু জরিমানা বা শাস্তি দেওয়ার প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে এবার হেলমেটবিহীন বাইক চালকদের হাতে বিনামূল্যে হেলমেট তুলে দিয়ে সচেতনতার এক নতুন বার্তা দিল পুলিশ প্রশাসন। সম্প্রতি পাথারকান্দি বাজার এলাকা এবং আছিমগঞ্জ তেমাথায় এই বিশেষ সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন সমজেলা পুলিশ সুপার অনির্বাণ শর্মা, পাথারকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মানসজ্যোতি বড়োসহ বিশাল পুলিশ বাহিনী।
দীর্ঘদিন ধরেই পাথারকান্দি ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার সচেতনতামূলক সভা, প্রচারাভিযান এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা হলেও অনেক চালক এখনও নিরাপত্তা বিধি মানতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এমনকি নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের জরিমানাও আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হওয়ায় এবার এক অভিনব পন্থা বেছে নেয় পুলিশ প্রশাসন।
এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সমজেলা পুলিশ সুপার অনির্বাণ শর্মা বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং মানুষের জীবন রক্ষা করা। আমরা বহুবার মানুষকে হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছি। জরিমানাও করেছি। কিন্তু এখনও অনেকেই নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীন। তাই আমরা ভাবলাম, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ নয়, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা দেখিয়েও সচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই আজ হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো ব্যক্তিদের হাতে বিনামূল্যে হেলমেট তুলে দেওয়া হচ্ছে। পাথারকান্দি ও আছিমগঞ্জ তেমাথা এলাকায় শুরু হয় বিশেষ অভিযান। পুলিসুপার অনির্বাণ শর্মা ও ওসি মানস জ্যোতি বড়ো স্বয়ং রাস্তায় নেমে অভিযানের নেতৃত্ব দেন। দূর থেকে পুলিশকে দেখতে পেয়ে অনেক হেলমেটবিহীন চালক প্রথমে দিক পরিবর্তন করার কিংবা সেখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশ তাদের থামিয়ে কোনো রকম রূঢ় আচরণ না করে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে ট্রাফিক আইন এবং হেলমেট ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বোঝান। এরপর চালকদের হাতে নতুন হেলমেট তুলে দেওয়া হলে অনেকেই বিস্মিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ পুলিশের এই মানবিক উদ্যোগে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অনেক চালক প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে তারা এতদিন হেলমেট ব্যবহারে অবহেলা করেছেন এবং ভবিষ্যতে সবসময় হেলমেট পরে মোটরসাইকেল চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
উপস্থিত সাধারণ মানুষের কাছেও এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে অনেক সময় মানুষকে নিয়ম মানানো গেলেও ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করলে তার প্রভাব অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়। পুলিশের এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, বর্তমান সময়ে যখন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন এমন মানবিক উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হেলমেট ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে এই ধরনের কর্মসূচি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই সচেতনতামূলক প্রচারণার পরও যদি কেউ ট্রাফিক আইন অমান্য করেন এবং হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালাতে থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কারণ আইন প্রয়োগের চূড়ান্ত লক্ষ্য শাস্তি নয়, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পাথারকান্দি পুলিশের এই মানবিক, দায়িত্বশীল ও সময়োপযোগী উদ্যোগ একদিকে যেমন জনমনে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে, অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার নতুন দিগন্তও উন্মোচন করেছে। অনেকের মতে, জরিমানার পরিবর্তে সচেতনতার এই বার্তা সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেলে দুর্ঘটনা কমবে, রক্ষা পাবে অসংখ্য মূল্যবান জীবন।



