উমিয়াম–শিলচর হাই-স্পিড করিডোর : দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরীক্ষা

।। মিতা দাসপুরকায়স্থ ।।
৪ জানুয়ারি : উমিয়াম–শিলচর হাই-স্পিড করিডোর প্রকল্পটি আজ আর কেবল একটি প্রস্তাব নয়, ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে এটি বাস্তবায়নের পথে স্পষ্টভাবে প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে আরেকটি তথ্যও সামনে এসেছে, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় মোট জমির প্রায় ৮৫ শতাংশই মেঘালয়ের ভূখণ্ড থেকে নেওয়া হবে। এই বাস্তবতা প্রকল্পটিকে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখে না— এটি প্রশাসনিক ন্যায্যতা, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও সামাজিক সংবেদনশীলতার একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত করে।

বরাক উপত্যকা দীর্ঘদিন ধরেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মাশুল দিয়ে এসেছে। উন্নত সড়ক যোগাযোগ এখানে নিঃসন্দেহে একটি মৌলিক প্রয়োজন। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে যাতায়াতের সময় কমবে, পণ্য পরিবহণে গতি আসবে এবং বরাক উপত্যকা দেশের মূল অর্থনৈতিক প্রবাহের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারবে।এই সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উন্নয়নের এই তাড়না কি সব ধরনের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ?

প্রকল্পের ভৌগোলিক বাস্তবতা বলছে, মেঘালয়ই এই করিডোরের মূল ভার বহন করবে। পাহাড়ি ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ মানে কেবল জমির মূল্য নির্ধারণ নয়, এটি মানুষের বাস্তুসংস্থান, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ। অতীতে এই প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় আপত্তি ও অনাস্থার যে বার্তা সামনে এসেছে, তা যদি প্রশাসনিক ‘ফাইল-নোট’ হিসেবেই বিবেচিত হয়, তবে এই উন্নয়ন ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকটের জন্ম দিতে পারে।

পরিবেশগত দিক থেকেও প্রকল্পটি একাধিক প্রশ্নের মুখে। মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল পরিবেশ ব্যবস্থার অন্যতম। সেখানে উচ্চ-গতির চার লেনের করিডোর নির্মাণ মানে শুধু রাস্তা কাটা নয়—এটি ভূমিধসের ঝুঁকি, বনসম্পদের ক্ষয় এবং জলপ্রবাহের স্বাভাবিক গতির উপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পরিবেশগত অনুমোদন পাওয়া মানেই দায়িত্ব শেষ—এই মানসিকতা বিপজ্জনক।

‘বরাকের নতুন দিগন্ত’র অবস্থান দ্ব্যর্থহীন। উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু উন্নয়নের নামে একতরফা চাপিয়ে দেওয়া নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। ভূমি অধিগ্রহণে স্বচ্ছতা, ক্ষতিপূরণে ন্যায্যতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পরিবেশ রক্ষায় কঠোর বাস্তব নজরদারি—এই শর্তগুলো পূরণ না হলে উমিয়াম–শিলচর হাই-স্পিড করিডোর ‘উন্নয়নের প্রতীক’ নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতার উদাহরণ হিসেবেই চিহ্নিত হবে।

বাস্তুসংস্থানে সংঘর্ষ এড়িয়ে এই প্রকল্প সফল হলে শুধু একটি রাস্তা হবে না, তা হবে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক পরিপক্বতার সাক্ষ্য। আর ব্যর্থ হলে, ইতিহাস একে মনে রাখবে আরেকটি তড়িঘড়ি উন্নয়ন সিদ্ধান্ত হিসেবে, যার মূল্য চুকিয়েছে সাধারণ মানুষ ও প্রকৃতি।

সবশেষে আরাবল্লী পর্বতমালার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আমাদের সামনে এক গুরুতর সতর্কবার্তা ছুঁড়ে দেয়। পরিবেশগত সুরক্ষা আইন, আদালতের নির্দেশ ও নীতিগত ঘোষণার পাশাপাশি কীভাবে পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস এবং প্রাকৃতিক জলাধার বিনষ্ট হয়েছে—আরাবল্লী আজ তার জীবন্ত উদাহরণ। সেখানে উন্নয়নের যুক্তি বারবার আইনের ঊর্ধ্বে স্থান পেয়েছে, আর তার ফল ভুগতে হচ্ছে জলসংকট, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে। আরাবল্লীকে কেন্দ্র করে পরিবেশের এই সংকট দিনে দিনে বাড়বে। এই অভিজ্ঞতা উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলও একইভাবে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এবং আইনত সুরক্ষার দাবিদার। উমিয়াম–শিলচর হাই-স্পিড করিডোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি প্রশাসনিক তাড়াহুড়ো, শিথিল নজরদারি ও ‘অনুমোদন মানেই ছাড়’—এই মানসিকতা কাজ করে, তবে কয়েক দশক পরে উন্নয়নের পরিসংখ্যান থাকলেও প্রকৃতির ক্ষতির দায় এড়ানো যাবে না। আরাবল্লী আমাদের শিখিয়েছে—অদূরদর্শী উন্নয়নের মূল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই দিতে হবে। প্রশ্ন : উত্তর-পূর্ব কি উন্নয়নের  অদূরদর্শী ধারার পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *