স্মৃতির আলোয় সঞ্জয় দা: এক মানবিক ক্রীড়া সাংবাদিকের প্রস্থান

Spread the news

।। এসএম জাহির আব্বাস।।
(সাংবাদিক, শ্রীভূমি)
২৮ ফেব্রুয়ারি : “সব ঠিক আছে তো, জাহির?” এই একটি প্রশ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মমতা, আশ্বাস ও আজীবনের মানবিক বন্ধন। এই মায়াভরা প্রশ্নটি আর শুনবো না। সত্যি কিছু মানুষের প্রস্থান কেবল একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয় তা একটি সময়ের একটি আবহের একটি মূল্যবোধের অবসান। প্রিয় সঞ্জয়দার অকাল প্রয়াণের সংবাদ আমাদের কাছে ঠিক তেমনই এক গভীর শূন্যতার অনুভব নিয়ে এসেছে। যেন হঠাৎ করেই সাংবাদিকতার আঙিনা থেকে নিভে গেল এক উজ্জ্বল উষ্ণ ও আশ্বাসদায়ী আলো।

আমার হৃদয়ে যিনি ছিলেন চিরআলোকিত
“জাহির, সব ঠিক তো?”এক অমলিন উচ্চারণ আর শুনবো না! 

তিনি ছিলেন বরাক উপত্যকার একটি সংবাদপত্রের একজন ক্রীড়া সাংবাদিক ও সংগঠক এই পরিচয় নিঃসন্দেহে গৌরবের। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল পেশাগত সীমারেখায় আবদ্ধ ছিল না। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন এক মানবিক মানুষ এক আন্তরিক সহকর্মী এক অকৃত্রিম শুভানুধ্যায়ী এবং অনেকের কাছে অভিভাবকতুল্য এক প্রিয় মুখ। সংবাদজগতের ব্যস্ততা চাপ এবং প্রতিযোগিতার ভিড়ে যেখানে সম্পর্কগুলো অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে আটকে যায়, সেখানে সঞ্জয় দা ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর কাছে খবরের চেয়েও বড় ছিল মানুষ। খবরের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ভুলতেন না মানুষের খোঁজ নিতে। প্রতিবছর বরাক উপত্যকার কর্মরত সংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের নিয়ে বরাক উপত্যাকা ক্রীড়া সাংবাদিক সংস্থা আয়োজিত মিডিয়া ক্রিকেট ফেস্টের খেলা দেখতে প্রতিদিন আসতেন মাঠে।  বলতেন সব ঠিকঠাক তো? এই ছোট্ট প্রশ্নটি যেন ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের সারাংশ। এই সাধারণ বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকত গভীর মমতা দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতা। তিনি কেবল তথ্য সংগ্রহ করতেন না, মানুষের মনও স্পর্শ করতেন। দায়িত্বশীল ক্রীড়া সাংবাদিকতার কঠোর বাস্তবতার মাঝেও তিনি মানবিকতার কোমল আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন।

দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেও তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেননি। বরং সহকর্মীদের পাশে থেকেছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। আমার সঙ্গে যখনই তাঁর দেখা হতো, মুখে মায়াভরা হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে হাত ধরে বলতেন “সব ঠিক আছে তো জাহির?” এই প্রশ্নের মধ্যে ছিল এক নিঃশব্দ আশ্বাস, এক আন্তরিক টান। আজ সেই কণ্ঠস্বর আর শোনা যাবে না এই ভাবনাই মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।

জীবন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আশাবাদী ও সহজ। তিনি বিশ্বাস করতেন, অকারণে জীবনকে ভারী করে তোলার কোনও প্রয়োজন নেই। টেনশন নয়, প্রয়োজন ইতিবাচক মনোভাব। তিনি বলতেন, সবসময় হাসিখুশি থাকতে হবে, নিজের জন্য সময় বের করতে হবে, মনকে শান্ত রাখতে হবে। হয়তো এই সহজ কথাগুলোই ছিল তাঁর জীবনদর্শনের মর্মকথা। আজ যখন আমরা তাঁর অনুপস্থিতির কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন তাঁর সেই উপদেশগুলো আরও বেশি করে হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। মনে হয়, তিনি যেন এখনও বলছেন জীবনকে ভালোবাসো, মানুষকে ভালোবাসো।

সঞ্জয় দা ছিলেন সংবাদ জগতের এমন একজন কলম যু্দ্ধা, সহকর্মীদের মধ্যে যাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল ভরসা। কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি স্থির থাকতেন, অন্যদের সাহস জোগাতেন। ক্রীড়া সাংবাদিকতার জগতে নিরলস পরিশ্রম, সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তিনি কখনও মানবিকতার জায়গা থেকে সরে আসেননি। মাঠের খেলার বিশ্লেষণের পাশাপাশি তিনি বুঝতেন মানুষের মন  অনুভব করতেন সহকর্মীদের দুঃশ্চিন্তা। তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা যেমন ছিল প্রশংসনীয় তেমনি মানুষের প্রতি তাঁর মমতাও ছিল অসীম।

আজ তাঁর প্রয়াণে শুধু বরাক উপত্যকাই নয়, সমগ্র অসমের সাংবাদিক মহল শোকাহত। রাজনৈতিক মহল, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। কিন্তু শোকের পাশাপাশি রয়েছে এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধও কারণ আমরা এমন একজন মানুষকে কাছ থেকে দেখার, জানার এবং তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন পেশাদারিত্ব মানে কেবল দায়িত্ব পালন নয় বরং তা হলো সততা সহানুভূতি এবং ইতিবাচক মানসিকতার সমন্বয়।

মৃত্যু অনিবার্য কিন্তু স্মৃতি অমর। সঞ্জয় দার হাসি তাঁর সহজ-সরল জীবনবোধ তাঁর আন্তরিক খোঁজখবর সবই আমার হৃদয়ে চিরকাল জীবন্ত থাকবে। এই স্মৃতিগুলোই আমাকে শক্তি দেবে পথ দেখাবে অনুপ্রেরণা জোগাবে। তাঁর জীবন আমাকে মনে করিয়ে দেয় সত্যিকারের বড় হওয়া পদবীতে নয় মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ায়। তাঁর অকাল প্রয়াণে আমি সহ গোটা বরাক উপত্যকা, অসম রাজ্যের সাংবাদিক সমাজ রাজনৈতিক মহল এবং বিভিন্ন সমাজসেবী সংগঠন সহ আমিও গভীর শোক প্রকাশ করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা। এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি ও ধৈর্য দান করুন পরম করুণাময় এই প্রার্থনাই রইলো।

আমার হাত ধরে বলা সেই প্রশ্ন? জাহিরের খোঁজ নেওয়ার মধ্য দিয়েই তিনি শিখিয়েছেন ইতিবাচক থাকা ও মানুষকে ভালোবাসা সেই মহান মানবীক ব্যক্তি বলা একটি প্রশ্নের ভেতর লুকানো এক মানুষ স্মৃতি হয়ে হৃদয়ে থাকবে আমার। সঞ্জয় দা আপনি যেখানেই থাকুন শান্তিতে থাকুন। আপনার জীবন আপনার আদর্শ এবং আপনার মানবিকতা আমার পথচলায় চিরকাল আলোর দিশা হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *