হাইলাকান্দি জেলার সাংস্কৃতিক জগৎ অন্ধকারের পথে, নজরুল সদন সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ

অনিন্দিতা পাল, হাইলাকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ১৬ জানুয়ারি : হাইলাকান্দি জেলার সাংস্কৃতিক জগৎ আজ গভীর সংকটের মুখে। একসময় জেলার সাহিত্য–সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নজরুল সদন (নজরুল ভবন) দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে চরম জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আনুমানিক ২০১৭ সাল থেকে এই ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বছর পেরিয়ে বছর কেটে গেলেও আজ পর্যন্ত এর সংস্কার বা বিকল্প কোনও স্থায়ী সমাধান গৃহীত হয়নি।

জানা যায়, একসময় নজরুল সদনে নিয়মিত নাটক, কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্কুল–কলেজের অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাহিত্যিক সভা অনুষ্ঠিত হত। জেলার নবীন শিল্পী, নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জন্য এই মঞ্চ ছিল অনুশীলন ও আত্মপ্রকাশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহটির ছাদ, দেয়াল, আসন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে কোনও অনুষ্ঠান আয়োজন করা তো দূরের কথা, ভেতরে প্রবেশ করাও অনেকাংশে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে । নজরুল সদন অচল হয়ে পড়ায় জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সামনে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। যদিও জেলায় রবীন্দ্র ভবন নামে আরেকটি প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে, তবে সেটির একদিনের ভাড়া প্রায় দশ হাজার টাকা। ছোট ও মাঝারি সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্কুল–কলেজ বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষে এই বিপুল অঙ্কের ভাড়া দিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বহু সংগঠন বাধ্য হয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করতে বা খোলা মাঠ, ছোট ঘর কিংবা অনুপযুক্ত স্থানে অনুষ্ঠান করতে বাধ্য হচ্ছে।

স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, এই পরিস্থিতির ফলে জেলার নবীন প্রতিভারা মঞ্চ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নাটক, নৃত্য, গান কিংবা আবৃত্তি—সব ক্ষেত্রেই নিয়মিত চর্চা ও প্রদর্শনের অভাবে শিল্পীরা ধীরে ধীরে উৎসাহ হারাচ্ছেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে হাইলাকান্দি জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সৃজনশীল পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, মুখ্যমন্ত্রী একবার হাইলাকান্দি সফরে এসে জেলার জন্য একটি আধুনিক, এয়ারকন্ডিশনড অডিটোরিয়াম নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণায় সাংস্কৃতিক মহলে নতুন আশার সঞ্চার হলেও বাস্তবে আজ পর্যন্ত সেই আশ্বাসের কোনও অগ্রগতি চোখে পড়েনি। পরিকল্পনা, বরাদ্দ কিংবা নির্মাণ—কোনও দিকেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায় না। ফলে আশ্বাসটি কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে বলে অভিযোগ উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে নজরুল সদন সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও শাসকদল, জনপ্রতিনিধি কিংবা জেলার অভিভাবক মন্ত্রীর পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ এখনও লক্ষ্য করা যায়নি। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্থাপনা আজ ধুঁকছে।

সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন মহলের জোর দাবি, অবিলম্বে নজরুল সদন সংস্কারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ঘোষণা করতে হবে অথবা অন্তত একটি সাশ্রয়ী ও আধুনিক বিকল্প প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করতে হবে, যাতে জেলার ছোট-বড় সব সংগঠন স্বল্প খরচে অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ পায়। নচেৎ অদূর ভবিষ্যতে হাইলাকান্দি জেলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চা সম্পূর্ণভাবে ম্লান হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *