নবভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা স্বামী বিবেকানন্দ

বরাক তরঙ্গ, ১২ জানুয়ারি, সোমবার,
স্বামী বিবেকানন্দ কেবল একজন সন্ন্যাসী নন, তিনি ছিলেন এক নবভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর চিন্তা, দর্শন ও কর্ম আজও ভারতকে পথ দেখায়। ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতির প্রশ্নে তিনি যে দৃষ্টিভঙ্গি রেখে গিয়েছেন, তা সংকীর্ণতা ও বিভাজনের সম্পূর্ণ বিপরীত। অথচ দুঃখজনকভাবে, আজ তাঁর নাম ব্যবহার করা হচ্ছে এমন সব উদ্দেশ্যে, যা তাঁর আদর্শের সঙ্গে আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

স্বামী বিবেকানন্দকে আজ নানা রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। অথচ বিবেকানন্দ কোনও দিনই সংকীর্ণ হিন্দুত্বের ধ্বজা তুলে দেশ গড়ার কথা বলেননি। তাঁর দর্শনের মূল সুর ছিল মানবতাবাদ, সর্বধর্মসমন্বয় ও মানুষের মুক্তি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন খ্রিস্টানকে হিন্দু হতে হবে না, মুসলমানকে বৌদ্ধ বা হিন্দু হতে হবে না; বরং প্রত্যেক ধর্ম অপর ধর্মের সারবস্তু গ্রহণ করে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য অটুট রেখে বিকশিত হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও বহুত্ববাদী ভারতের সবচেয়ে শক্ত ভিত।
বিবেকানন্দের আরেকটি উক্তি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে “আমরা মানবজাতিকে সেই স্থানে নিয়ে যেতে চাই, যেখানে বেদও নেই, বাইবেলও নেই, কোরানও নেই, অথচ কাজ করতে হবে বেদ-বাইবেল-কোরানকে সমন্বয় করেই।” এর অর্থ ধর্মের বিনাশ নয়, বরং ধর্মীয় সংকীর্ণতার অবসান। তিনি কেবল সব ধর্মকে সহ্য করার কথা বলেননি, বরং সব ধর্মকেই সত্য বলে বিশ্বাস করেছিলেন। এই মহৎ আদর্শ আড়াল করে বিবেকানন্দের নামে প্রচার চালানো মানে তাঁর দর্শনের সঙ্গে প্রতারণা করা। উদ্দেশ্য যদি মহৎ না হয়, তবে যত বড় স্লোগানই তোলা হোক না কেন, তা বেশিদূর এগোতে পারে না।

স্বামী বিবেকানন্দের কাছে ধর্মের মাপকাঠি ছিল মানুষের দুঃখ লাঘব। তিনি বলেছিলেন, শুধু ভারতবর্ষের মানুষ নয়, একটি প্রাণীও যদি অনাহারে থাকে, তবে তিনি ধর্মপ্রচার করবেন না। তাঁর চোখে মানুষই ছিলেন ভগবান, আর মানুষের সেবাই ছিল ঈশ্বর আরাধনার শ্রেষ্ঠ পথ। এই মানবিক দর্শন আজকের সময়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক, যখন ধর্মকে অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতা ও বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে তিনি সমাজের উচ্চশ্রেণির একাধিপত্যের পতন চেয়েছিলেন এবং শূদ্র জাগরণের মধ্য দিয়েই নতুন ভারত গড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল শোষিত, অবহেলিত মানুষের জাগরণেই দেশের প্রকৃত মুক্তি। অথচ আজ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বামী বিবেকানন্দের নাম সামনে রেখে জাতপাতের রাজনীতি খেলছেন এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মানুষ। কোথাও না কোথাও জাতি, বর্ণ কিংবা উচ্চ-নিম্নের বিভাজন উসকে দিয়ে তাঁরা সমাজে অশান্তি ছড়াচ্ছেন।

স্বামী বিবেকানন্দের স্বপ্নের ভারত ছিল যুক্তিবাদী, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক। সেই ভারত গড়তে হলে প্রয়োজন তাঁর আদর্শকে অন্তরে ধারণ করা, মুখে স্লোগান তোলা নয়। আজকের ভারত যদি সত্যিই তাঁর উত্তরাধিকার বহন করতে চায়, তবে বিভাজনের রাজনীতি নয়—মানুষে মানুষে ঐক্য, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের পথেই এগোতে হবে। তবেই স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *