মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ২১ জানুয়ারি : নাথধর্মের উৎপত্তি দেবাদিদেব মহাদেবের চেতনা থেকে এই ঐতিহ্যবাহী ধর্মধারার বিস্তার ঘটেছে মহাযোগী গোরক্ষনাথের হাত ধরে। গুরুপরম্পরাই নাথধর্মের মূল ভিত্তি। গুরুপরম্পরা ব্যতীত দীক্ষা সম্ভব নয়, সাধনাও সম্পূর্ণ হয় না এই তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরলেন ওড়িশার কেয়ার ব্যাঙ্ক মঠের অধীশ্বর, প্রখ্যাত যোগগুরু স্বামী শিবনাথজি মহারাজ।
শ্রীভূমিতে অনুষ্ঠিত এক বিশাল ধর্মীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, নাথধর্মের বিজয়গাথা কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়; এই ধর্মধারা চিন, তিব্বত, সিংহল (শ্রীলঙ্কা) ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যোগসাধনার মূল উদ্দেশ্য হল কায়া সাধনার মাধ্যমে নিজের আত্মাকে জানা ও অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করা। মানুষের শরীর ও চেতনায় যে অসীম শক্তি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে, সেই শক্তির পুনর্জাগরণের পথনির্দেশ দিয়েছেন নাথ সাধকগ অতীতেও, বর্তমানেও। স্বামী শিবনাথজি মহারাজ আরও বলেন, নাথধর্ম সর্বজীবে সমদয়ার শিক্ষা দেয়। কেবল মানুষ নয়, আব্রহ্মস্তম্ভ পর্যন্ত সমগ্র জগতের কল্যাণ কামনাই এই ধর্মের মূল দর্শন। উচ্চারণ” বা চেতনার জাগরণই হিন্দু ধর্মের মূল সুর, আর সেই ধর্মীয় দর্শনকে যুগোপযোগী রূপ দিয়েছেন নাথ যোগিরা। ৮৪ জন নাথ সিদ্ধার মধ্যে অন্যতম সত্যনাথ পন্থ, সেই পন্থেরই অনুসারী তিনি এবং তাঁর শিষ্যবৃন্দ।চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, বাংলাদেশ ও নেপাল-সহ দেশের নানা প্রান্তে নাথধর্মের প্রচার ও প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
ত্রিপুরা ও অসমে প্রায় কুড়িটির মতো গোরক্ষনাথ মঠ প্রতিষ্ঠা করে তিনি নাথধর্মের সাংগঠনিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছেন। নাথধর্ম মানুষকে জাতি-ভেদ ভুলে সকলকে আপন করে নেওয়ার শিক্ষা দেয় এই মানবতাবাদী দর্শনের কথাও তুলে ধরেন তিনি।দেবাদিদেব মহাদেব নাথধর্মের মূল উপাস্য হলেও, কোনও ধর্ম বা সম্প্রদায়কে খাটো করে নয় এই বার্তা দিতে গিয়ে তিনি ঋগবেদের অমোঘ বাণী উদ্ধৃত করেন একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি অর্থাৎ সত্য এক, জ্ঞানীরা তাকে নানা নামে অভিহিত করেন।
তিনি জানান, পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তিনিই প্রথম ‘রুদ্রযজ্ঞ’ চালু করেন। রুদ্র অর্থ শিব—আজ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই রুদ্রযজ্ঞে অংশ নিচ্ছেন। অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডে অনন্ত কোটি প্রাণীর মঙ্গল কামনায় সকলকে একসঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। শ্রীভূমির রেলওয়ে কলোনির দুর্গাপল্লিতে দীপক নাথের বাসভবনে সোমবার, ১৯ জানুয়ারি এই ধর্মীয় সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে রুদ্রযজ্ঞ, দীক্ষাদান, উপনয়ন এবং শিব ও গোরক্ষনাথের বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। যজ্ঞ পরিচালনা করেন ভক্তিনাথ স্বামীজি এবং পূজা সম্পন্ন করেন পুরোহিত নরেশ নাথ। এ উপলক্ষে আয়োজিত হয় এক আলোচনা সভা। নাথ মিশনের চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন বিধায়ক প্রণবকুমার নাথের পৌরহিত্যে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশ্বশান্তি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, নাথধর্মের বিস্তার এবং ব্যক্তিজীবনে সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বক্তব্য রাখেন নাথ মিশনের কর্মকর্তা রবীন্দ্র নাথ, সিতু নাথ, শিক্ষিকা ও কবি জয়ন্তী নাথ, জেলা বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি সুব্রত ভট্টাচার্য, জেলা পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি আশীষ নাথ-সহ বিশিষ্টজনেরা। সকালে ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন করেন বরিষ্ঠ সাংবাদিক মিহির দেবনাথ এবং প্রাক্তন বিধায়ক প্রণব কুমার নাথ। দিনভর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পর বহু ভক্ত মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেন। স্বামীজির শান্তি মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ভক্তিময় পরিবেশে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।



