শীতে কাবু বরাক উপত্যকার জনজীবন

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ২ জানুয়ারি : বরাক উপত্যকায় যেন হঠাৎ করেই নেমে এসেছে কনকনে শীতের দাপট। দু’দিন নয়, টানা কয়েকদিন ধরে হালকা থেকে মাঝারি গতির শীতল বাতাস ও ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার প্রভাবে উপত্যকার সর্বত্র জাঁকিয়ে বসেছে তীব্র শীত। ইংরেজি নববর্ষের শুরুতেই প্রকৃতির এমন রুক্ষ রূপে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বরাক উপত্যকার স্বাভাবিক জনজীবন। শীত ও কুয়াশার যুগপৎ আঘাতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যেন স্থবির হয়ে পড়েছে। গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাত থেকেই বরাক উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে হঠাৎ ঘন কুয়াশা নেমে আসে। দমকা হাওয়ার সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা বাতাসে তাপমাত্রা দ্রুত নিম্নমুখী হয়। সকাল থেকে শুরু করে সারাদিনই বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়তে দেখা যাচ্ছে। অনেক এলাকায় দুপুর গড়িয়েও সূর্যের দেখা মিলছে না, ফলে শীতের প্রকোপ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এই প্রতিকূল আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা, হাট-বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে লোকসমাগম চোখে পড়ার মতো কমে গেছে। সাধারণ মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষদের জন্য এই শীত চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন পরিবারে ঠান্ডাজনিত জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়তে শুরু করেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তীব্র শীত থেকে রক্ষা পেতে বরাক উপত্যকার তিন জেলা শ্রীভূমি, হাইলাকান্দি ও কাছাড় জেলার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষকে দলবদ্ধভাবে আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করতে দেখা যাচ্ছে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তার ধারে, বাসস্ট্যান্ড, চায়ের দোকানের সামনে কিংবা খোলা মাঠে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন দিনমজুর, শ্রমিক, রিকশাচালকসহ খেটে খাওয়া মানুষরা। অনেকের পক্ষেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করা সম্ভব না হওয়ায় আগুনই তাঁদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে।

এদিকে, পৌষ মাস শেষের পথে থাকলেও কৃষকদের দুশ্চিন্তা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ধান ভাঁড়ারে তোলার মৌসুম চললেও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ও ঘন কুয়াশার কারণে মাঠে নেমে কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কৃষক। ভোরের দিকে কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেশি থাকছে যে মাঠে নামা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এর ফলে ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে, যা কৃষকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলছে।শ্রীভূমি জেলার পাথারকান্দি বিধানসভা এলাকার লোয়াইরপোয়া, বাজারিছড়া, কটামণি-সহ বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবার সকাল থেকেই অসংখ্য মানুষকে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা গেছে। আগুন ঘিরে দাঁড়িয়েছেন পুরুষ, মহিলা, শিশু ও প্রবীণরা। তাঁদের সবার মুখে একটাই কথা—এমন হাড় কাঁপানো শীত বিগত আট থেকে দশ বছরের মধ্যে পড়েনি। এই অস্বাভাবিক ঠান্ডায় বিশেষ করে বয়স্ক, অসুস্থ রোগী ও শিশুদের পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের ভবঘুরে ও অসহায় মানুষদের নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল।স্থানীয়দের মতে, যদি এভাবে আরও কয়েকদিন তীব্র শীত অব্যাহত থাকে, তাহলে শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তাঁরা।সামগ্রিকভাবে বলা যায়, গত তিন দিন ধরে বরাক উপত্যকার বেশিরভাগ এলাকার মানুষ প্রচণ্ড শীতের কবলে পড়েছেন। জনজীবন বিপর্যস্ত, স্বাভাবিক কাজকর্মে মারাত্মক ছন্দপতন ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের তরফ থেকে দ্রুত শীতবস্ত্র বিতরণ, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা এবং দুস্থ, অসহায় ও ভবঘুরে মানুষদের জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠতে শুরু করেছে।এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েকদিনে বরাক উপত্যকার আবহাওয়া পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং এই শীতের দাপট থেকে কবে মুক্তি পায় উপত্যকার মানুষ। একই সঙ্গে প্রশাসন দুস্থ, অসহায় ও ভবঘুরে মানুষদের জন্য কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন উপত্যকার সাধারণ মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *