মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ৯ মার্চ : বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক মানচিত্রে পাথারকান্দি বিধানসভা কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। এক সময় এই কেন্দ্রকে কংগ্রেসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী দুর্গ হিসেবেই ধরা হত। বহু দশক ধরে এখানে কংগ্রেসের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে নির্বাচনের ফলাফল অনেকটাই আগাম অনুমান করা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সমীকরণে এসেছে বড় পরিবর্তন। গত এক দশকে পাথারকান্দির রাজনীতিতে এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন বর্তমান মন্ত্রী ও বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু পাল।
২০১৬ সালের অসম বিধানসভা নির্বাচন পাথারকান্দির রাজনীতিতে বড় মোড় আনে। সেই নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার জয়ী হন কৃষ্ণেন্দু পাল। এই জয়ের মাধ্যমে শুধু নতুন বিধায়কের আবির্ভাবই ঘটেনি, বরং দীর্ঘদিনের কংগ্রেস ঘাঁটিতে বিজেপির শক্তিশালী উত্থানের সূচনা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই নির্বাচনের পর থেকেই ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে বিজেপির সংগঠন মজবুত হতে শুরু করে এবং জনমতের একটি বড় অংশ পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রেখে দ্বিতীয়বারের মতো বিধায়ক নির্বাচিত হন কৃষ্ণেন্দু পাল। টানা দুইবার জয়ের মাধ্যমে তিনি পাথারকান্দিতে বিজেপির অবস্থান আরও শক্তিশালী করেন। পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন অসম সরকারের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান তিনি। মন্ত্রী হওয়ার পর শুধু পাথারকান্দি নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন কৃষ্ণেন্দু পাল।
পাথারকান্দি এলাকায় গত কয়েক বছরে রাস্তা ও সেতু নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন, পানীয় জল প্রকল্প এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মতো বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি বিজেপি নেতৃত্বের। এসব উন্নয়নমূলক উদ্যোগের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৃষ্ণেন্দু পালের গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ফলে এক সময় কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পাথারকান্দি এখন অনেকের কাছেই বিজেপির দুর্গ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
তবে রাজনীতির সমীকরণ কখনও স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে আবার সক্রিয় হয়েছে কংগ্রেসও। আসন্ন নির্বাচনে পাথারকান্দি আসনে কংগ্রেসের প্রার্থী করা হয়েছে প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক কার্তিক সেনা সিনহাকে। এক সময় বিজেপির টিকিটে নির্বাচিত হওয়া এই নেতা এবার কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচনী ময়দানে নামায় রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হওয়ায় কার্তিক সেনা সিনহার একটি নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকা এবং নিয়মিত জনসংযোগের অভাব তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—পাথারকান্দির রাজনৈতিক ময়দানে কি নতুন সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে? কংগ্রেস কি পুরনো শক্ত ঘাঁটি পুনরুদ্ধার করতে পারবে, নাকি উন্নয়ন ও সংগঠনের জোরে আবারও নিজের অবস্থান আরও মজবুত করবেন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল?

অন্যদিকে, কংগ্রেসের কাছে এই নির্বাচন শুধু একটি আসন জয়ের লড়াই নয়, বরং এক সময়কার নিজেদের শক্ত ঘাঁটি পুনরুদ্ধারের লড়াইও বটে। তাই সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভোটারদের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের উপর জোর দিচ্ছে দলটি।
সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে পাথারকান্দির রাজনৈতিক পরিবেশ ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত। চায়ের দোকান থেকে বাজারের আড্ডা—সব জায়গাতেই এখন একটাই প্রশ্ন, পাথারকান্দির আগামী রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে এগোবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে পাথারকান্দিতে কৃষ্ণেন্দু পালের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে রয়েছে। মন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রশাসনিক সক্রিয়তা, উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তাঁকে ভোটারদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। পাশাপাশি এই কেন্দ্রে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তিও দৃঢ় বলে মনে করা হচ্ছে।



