বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি অটোনমাস কাউন্সিলের দাবিতে পাথারকান্দিতে বিশাল র‍্যালি

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ৩ ফেব্রুয়ারি : “ইমারলাম পুঞ্চি পালক, আমার দাবি দেনা লাগতই”—এই শ্লোগানের প্রতিধ্বনিতে মঙ্গলবার দুপুরে উত্তাল হয়ে উঠল পাথারকান্দি শহর। অধিকার, পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার দাবিতে রাজপথে নেমে এল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি জনগোষ্ঠী। ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক নিরাপত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি অটোনমাস কাউন্সিল গঠনের আহ্বানে এক বিশাল র‍্যালি ও গণআন্দোলনের সাক্ষী থাকল পাথারকান্দি। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সৈনিক ওয়েলফেয়ার অর্গেনাইজেশনের নেতৃত্বে আয়োজিত এই আন্দোলনে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। প্রায় দেড় হাজার আন্দোলনকারী এদিন র‍্যালিতে অংশ নেন।

দুপুর ১২টা নাগাদ পাথারকান্দি সৈনিক ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে র‍্যালিটি শুরু হয়। আমাদের দাবি দিতে হবে, নাহলে আন্দোলন চলবে অটোনমাস কাউন্সিল আমাদের অধিকার এই ধরনের শ্লোগানে মুখরিত হয়ে র‍্যালিটি পাথারকান্দি শহরের প্রধান সড়ক পরিক্রমা করে তেমাথা হয়ে পাথারকান্দি মহকুমা প্রশাসনিক কার্যালয়ের সামনে এসে জমায়েত হয়। সেখানে আন্দোলনকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে জোরদার শ্লোগান ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চালান। পরবর্তীতে দুপুর আনুমানিক ২টা নাগাদ আন্দোলনকারীরা পাথারকান্দি মহকুমা কমিশনারের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্ম্মার উদ্দেশ্যে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। স্মারকলিপিতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি অটোনমাস কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব অবিলম্বে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করে অনুমোদন দেওয়ার জন্য জোরালো আবেদন জানানো হয়। স্মারকলিপিতে আন্দোলনকারীরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ দাবি কমিটির পক্ষ থেকে ক্যাবিনেট বিবেচনার জন্য একটি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১৬ মার্চ অসম সরকারের ডব্লুপিটি ও বিসি বিভাগ একটি চিঠির মাধ্যমে জানায় যে, বিধানসভা নির্বাচনের আচরণবিধি শেষ হওয়ার পর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। কিন্তু চার বছর অতিক্রান্ত হলেও আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।

এছাড়া, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে অসম চুক্তির ৬ নম্বর দফার ‘হাই-পাওয়ার কমিটি’-র রিপোর্ট অনুযায়ী বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়কে অসমের খিলঞ্জিয়া বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই সম্প্রদায়কে অসম সরকার অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে।

স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১০-১১ সালে এই সম্প্রদায়ের জন্য একটি উন্নয়ন পরিষদ গঠন করা হলেও দুর্বল আর্থিক পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক কাঠামোর অভাবে সেটি জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়ের কোনও প্রতিনিধি আজ পর্যন্ত অসম বিধানসভা বা লোকসভায় পৌঁছাতে পারেননি বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে আন্দোলনকারীরা উল্লেখ করেন যে, ইউনেস্কো বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষাকে ‘বিপন্ন ভাষা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

স্মারকলিপি প্রদান শেষে আন্দোলনকারীরা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, আগত অসম বিধানসভা নির্বাচনের আগেই যদি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি অটোনমাস কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করে অনুমোদন না দেওয়া হয় এবং অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে আগামী দিনে এই আন্দোলন আরও বৃহত্তর ও তীব্র রূপ নেবে। প্রয়োজনে রাজ্যব্যাপী আন্দোলনে নামারও হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনকারীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *